htmega-pro domain was triggered too early. This is usually an indicator for some code in the plugin or theme running too early. Translations should be loaded at the init action or later. Please see Debugging in WordPress for more information. (This message was added in version 6.7.0.) in /home4/rohitifo/glocalcharcha.in/wp-includes/functions.php on line 6170অলঙ্করণে – সুমিত দাস
১।
রাত হয়েছে ন’টার মতো। ট্রেন ছাড়তে এখনও প্রায় মিনিট কুড়ি বাকি। একটু আগে ষ্টেশনে এসে না পৌঁছানোর ফলে এর আগেও তিনবার ট্রেন ধরতে না পারার স্মৃতি এখনও বেশ সতেজ, তাই তাড়াহুড়ো করেই এবার আগে এসে অপেক্ষা করা।
কেউ একজন ডাকল মনে হচ্ছে। পিছনে ফিরে তাকাতেই একজন বয়স্ক লোককে চোখে পড়ল। বয়স পঁচাত্তর-আশি তো হবেই। চশমার ভাঙ্গা ফ্রেমের ভেতরে দুটো ক্লান্ত চোখের ঝাপসা চাহনি। কাছে গিয়ে জানতে চাইলাম “চাচা ডেকেছেন আমায়”? বার্ধক্যের ভারে কেঁপে কেঁপে উঠা শরীর নিয়ে ভাঙ্গা ফ্রেমের ভেতরে থাকা দুটো ক্লান্ত চোখ আমার দিকে রেখে বললেন ” হুম”।
তিনি সামনে থাকা ফ্লাস্ক থেকে কাপে চা নিলেন। দেখলাম, পাশেই ঝুলতে থাকা পলিথিন থেকে এক টুকরো লেবু নিয়ে তিন আঙ্গুল দিয়ে চাপছেন।পুরো হাত কাঁপছে বয়সের ভারে থরথর করে। খুব মায়া হল। বললাম, “চাচা, আমি লেবু খুব একটা খাইনা।“
তিনি চায়ের কাপ আমাকে দিয়ে বললেন, “বাবা পত্রিকা লাগবে?” বললাম, “দিন একটা।“ তারপর চায়ে চুমুক দিতে দিতে আরও বললাম, “চাচা একটা কথা জিজ্ঞেস করি…?”
ভদ্রলোক চুপ করে থাকলেন কিছুক্ষণ। বললাম, “চাচা, আপনি কি কিছু মনে করেছেন আমার কথায়?”
তিনি কিছুই বললেন না। এবারও চুপ করেই থাকলেন। বুঝতে বাকি রইল না, তিনি এমন প্রশ্নে কিছুটা বিব্রতবোধ করেছেন। তাই ক্ষমা চেয়ে পত্রিকার দাম আর চায়ের বিল মিটিয়ে যে’ই উঠেছি, তিনি ডেকে বললেন, “বাবা এই ট্রেনে আপনি যাবেন না।“
একটু হকচকিয়ে বললাম, “মানে?”
তিনি তাঁর চায়ের ফ্লাস্ক এবং অবিক্রীত পত্রিকাগুলো গোছাতে লাগলেন। আমি আবার জানতে চাইলাম, “এই ট্রেনে কেন আমাকে যেতে নিষেধ করছেন?” তিনি কিছুই বললেন না। কপালে কিঞ্চিৎ ভাঁজ পড়ল আমার। তিনি বোধহয় সেটা খেয়াল করলেন, তাই বললেন, “ষ্টেশন থেকে আপনার বাড়ি কি বেশি দূর?” বললাম, “কেন?”
তিনি বললেন, “ইচ্ছে করলে বাবা আপনি আমার বাড়িও রাতটা থেকে যেতে পারেন,আমার বাড়ি খুব একটা দূরে নয়.. ঐ যে বাজার পেরুলেই বাড়ি…”, বলেই তিনি হাঁটতে শুরু করলেন। এত রাতে কী যে করব, বুঝতে পারছিলাম না। গ্রামের পাশের ষ্টেশনগুলো সন্ধ্যার পর থেকেই কেমন ভূতুরে হতে শুরু করে এবং এটাও তার ব্যতিক্রম নয়।
২।
কি বুঝে যেন, ভদ্রলোকের বাড়িতে উঠলাম গিয়ে সেই রাতদুপুরে। শীর্ণ এক পুরোনো জনশূন্য বাড়ি সে বাড়িতে তিনি ছাড়া দ্বিতীয় কেউ নেই। টিউবওয়েল চেপে হাতমুখ ধুয়ে এসেই দেখি তিনি পাটি বিছিয়ে রাতের খাবারের আয়োজন করলেন। জিজ্ঞেস করলাম, “বাড়িতে আর লোকজন কোথায়?” বললেন, “আমি ছাড়া আমার আর কেউ নেই।“ কথা বাড়ালাম না। কেমন যেন লাগছে নিজের মধ্যে। খাওয়া শেষ করতেই আমার বিছানা দেখিয়ে তিনি বললেন, “ভালো ঘুম দিবেন। সকালে আমি ডেকে নিব।“
শুয়ে-বসে রাত কাটাব এমন সিদ্ধান্ত নিলাম। কিছুক্ষণ পরে, তিনি এসে জানতে চাইলেন, ঘুমিয়েছি কিনা? বললাম, “চাচা আসেন।“ তিনি বসলেন এবং নিজ থেকেই বললেন, “আমার নাম মহিদুল।“ এরপর…
তিন ভাই ও এক বোন ছিলেন তারা। বাবা মা দু’জনেই প্রাইমারি স্কুলে শিক্ষকতা করতেন। ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে তিনি সব হারিয়েছেন। খেয়াল করলাম, তাঁর চোখ ভিজতে শুরু করেছে। বললেন, “আমার বয়স তখন ২৬। ভাই-বোনদের মধ্যে আমি সবচেয়ে বড়। টাউন কলেজ থেকে সবেমাত্র বি.কম পাশ করেছি জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে। মার্চ মাস থেকে হঠাৎ দেশে যুদ্ধ শুরু হল।“
তাঁর পরিস্কার মনে আছে, বাবা মহিউদ্দিন সাহেব ও মা দিলারা জামানের সাথে মেজভাই মবিন ও ছোটবোন মুন্নী-সহ সবাই মিলে তাঁরা বাড়ির উঠোনে বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ শুনেছিলেন। বাবার চোখেমুখে দেখেছিলেন তীব্র উত্তেজনা। মহিউদ্দীন সাহেব বারবার বলছিলেন, “এবার কিছু একটা হবেই হবে।“
খালাতো বোন মিতুর সাথে মুহিদুল সাহেবের বিয়ের কথা সম্পূর্ণ ঠিক করা ছিল। খালা খালু মারা যাওয়ার পর থেকেই মিতু মহিদুল সাহেবদের বাড়িতেই বড় হয়েছে। তাই মা দিলারা জামান বোনের মেয়েকেই ছেলের বউ করে চেয়েছিলেন।
কিন্তু ২৫শে মার্চের পর থেকেই সব এলোমেলো হয়ে পড়ল। মহিদুল সাহেব কিছুক্ষণ থামলেন। তারপর আবার বলতে শুরু করলেন…
“ছোটো ভাই মাজেদের বয়স তখন উনিশ ছিল। মাজেদই প্রথম আমাকে যুদ্ধে যাওয়ার কথা বলে। বাবা কোনও আপত্তি করলেন না। বরং বললেন, যদি দেশ ও দশের তরেই না লাগে জীবন, তবে মনুষ্যত্বের কি দাম থাকে আর…”
আগ্রহ, উত্তেজনা, আবেগ ও দেশপ্রেম বুকে ধারণ করেই সেদিন যুদ্ধে গিয়েছিলেন দু’ভাই। গ্রামে এ খবর ছড়িয়ে পড়ে বিদ্যুৎবেগে। ফলস্বরূপ তীব্র রোষানলে পড়তে হয় তাদের পরিবারের সবাইকেই। একদিন রাতে পাকবাহিনী হানা করে বাড়িতে। কে বা কারা পাকসেনাদের মিথ্যে খবর দিয়েছিল যে, মহিদুল আর মাজেদ-সহ আরও কিছু মুক্তিসেনা ওই বাড়িতেই আছে।
পুরো বাড়ি ঘেরাও করল পাকসেনার প্রতিনিধিরা। মহিদুল ও মাজেদকে না পেয়ে বাড়ির বাকি সকলের ওপর চলল অমানুষিক সব নির্যাতন। বাবা ও মাকে বাড়ির উঠোনে এনে ব্রাশ-ফায়ার করা হয়। বোন মুন্নী ও খালাতো বোন মিতুকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয় পাক ক্যাম্পে। তারপর আর তাদের খোঁজ মেলেনি।
৩।
মহিদুল সাহেব আবার থেমে গেলেন কিছুক্ষণের জন্য। আমি কাছে এসে হাত ধরতেই বললেন, ‘ “মাজেদকে আমি আমার চোখের সামনেই গুলি খেয়ে শহিদ হতে দেখেছি। কিন্তু যুদ্ধ-শেষে বাড়ি ফিরে এসেছি স্বাধীনতা নিয়ে, নিজের দেশের, বাংলাদেশের পতাকা নিয়ে। আর সেই থেকে এই বাড়িতে আর কাউকে দেখিনি”।
বললাম, “আপনি আর বিয়ে করেননি?”
বললেন, “মিতুকে খুব ভালোবাসতাম জানেন বাবা। তাই আর কাউকে বিয়ে করে সংসার পাততে ইচ্ছে করেনি।“
তখন বাংলাদেশ জুড়ে গভীর রাতের অন্ধকার নেমেছে। জানলার বাইরের, সেই অন্ধকারের দিকে চেয়ে বললাম, “সরকারি কোনো চাকরিতে কেন যোগ দেননি? আপনি মুক্তিযোদ্ধা। আপনি…” মাঝপথে কথা থামিয়ে উত্তর দিলেন, “স্বাধীনতাই চেয়েছিলাম, চাকরি না।“
টের পাইনি, কখন সকাল হয়ে গেছে। বাড়ি থেকে বের হলাম, এক-পৃথিবী ঘোর নিয়ে। ষ্টেশনে পৌঁছেই জানতে পারলাম, আজ কোনও ট্রেন চলাচল নেই। কারণ জানতে গিয়ে জানলাম, গত রাতের শেষ ট্রেনটি আখাউড়া ষ্টেশনে গিয়ে লাইনচ্যুত হয়েছে এবং ব্যাপক হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। কিছুক্ষণের জন্য থমকে গেলাম, কারণ এই ট্রেনেই কাল আমার ঢাকা পৌঁছানোর কথা ছিল।
]]>