Notice: Function _load_textdomain_just_in_time was called incorrectly. Translation loading for the htmega-pro domain was triggered too early. This is usually an indicator for some code in the plugin or theme running too early. Translations should be loaded at the init action or later. Please see Debugging in WordPress for more information. (This message was added in version 6.7.0.) in /home4/rohitifo/glocalcharcha.in/wp-includes/functions.php on line 6170

Warning: Cannot modify header information - headers already sent by (output started at /home4/rohitifo/glocalcharcha.in/wp-includes/functions.php:6170) in /home4/rohitifo/glocalcharcha.in/wp-includes/feed-rss2.php on line 8
GloCal Charcha https://glocalcharcha.in Latest news from around the world Fri, 18 Mar 2022 23:10:57 +0000 en-US hourly 1 https://wordpress.org/?v=7.0 https://glocalcharcha.in/wp-content/uploads/2021/01/cropped-glocal-icon-32x32.png GloCal Charcha https://glocalcharcha.in 32 32 মোমের দেশ আর কাচের রাজ্য: আসানসোলের মোম-মিউজিয়াম ও শিশমহল https://glocalcharcha.in/2022/01/24/momer-desh-aar-kaancher-rajyo/ https://glocalcharcha.in/2022/01/24/momer-desh-aar-kaancher-rajyo/#comments Mon, 24 Jan 2022 23:26:12 +0000 https://glocalcharcha.com/?p=3289
লেখা ও ছবি – সুপর্ণা ঘোষ

বেশ কিছুদিন আগেই শুনেছিলাম আসানসোলে ওয়াক্স মিউজিয়াম আর শিশমহলের কথা। ঠিক করেছিলাম যেমন করেই হোক দেখে আসতে হবে দু’টোই। বিশেষ করে যখন শুনলাম, বর্তমানে মানে এখনের সময়ে তৈরি শিশমহল এই আসানসোলেরটাই প্রথম! এর আগে সেই রাজা–বাদশাদের আমলে শিশমহলের কথা তো সব্বাই জানি।

আরে বাঃ, এ তো ভারি রোমাঞ্চকর ব্যাপার! তার উপরে, এ শিশমহল আবার নিখাদ এক বাঙালী শিল্পীর তৈরি, ওয়াক্স মিউজিয়ামও তাঁরই তৈরি। নাম শ্রী সুশান্ত রায়। তাই ওনার নামেই মিউজিয়ামটির নাম।

মোম-মিউজিয়াম

অবশেষে সেই সৌভাগ্য হয়েছিল গতবছরের ডিসেম্বর মাসে ( ২০২১-এর ২৯শে ডিসেম্বর )। বিকেলের দিকে আমরা পৌঁছলাম মিউজিয়ামে। জনপ্রতি ১০০ টাকা টিকিট করে প্রথমে প্রবেশ করলাম ওয়াক্স মিউজিয়ামে। একতলায় এটি আর দোতলায় শিশমহল। উত্তমকুমার, সুচিত্রা সেন, অমিতাভ বচ্চনের “কোন বানেগা ক্রোড়পতির” সেট, নিরজ চোপড়া, ফুটবলার শৈলেন মান্না, রোনালডিনহো, বাংলার বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু, সুভাষ চক্রবর্তী ইত্যাদি অনেকের মোমের মূর্তি দেখতে দারুন লাগল।

শিশমহল

তারপর চললাম দোতলায় শিশমহল দেখতে। একঝাঁক দর্শনার্থী বেরিয়ে যাওয়ার পরে আমরা প্রবেশ করলাম এবং বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলাম! অসাধারণ, অনবদ্য এই শিশমহল! কত যত্ন নিয়ে যে শিল্পী এটা তৈরি করেছেন, তা না দেখলে বিশ্বাস করাই কঠিন! সিংহাসনের মত চেয়ারটায় বসে সত্যিই নিজেকে কেমন মহারাণী মনে হচ্ছিল! মেঝে পর্যন্ত আয়না কাঁচ দিয়ে তৈরী, দরজার কাছে দাঁড়িয়ে মনে হয়েছে সত্যিই বুঝি কোনও রাজা–বাদশার শিশমহলে প্রবেশ করলাম। বিস্ময় ভরে কতক্ষণ যে দেখেছি!

শিল্পী-সাক্ষাৎ

বাইরে বেরিয়ে আর এক চমক অপেক্ষা করেছিল আমাদের জন্য। সাক্ষাৎ হল শিল্পী সুশান্ত রায়ের সাথে। এ এক পরম পাওনা। কথা হল কিছুক্ষণ। ফিরে আসার সময় অবশ্যই মনে হয়েছে অন্তত শিশমহলটি দেখতে আরও বার কয়েক যাওয়াই যায়।

হলফ করে বলতে পারি, এই ওয়াক্স মিউজিয়াম ও শিশমহল ছোট থেকে বড় সব্বার ভালো লাগতে বাধ্য।

মনে রাখবেন

ওয়াক্স মিউজিয়াম ও শিশমহলের ঠিকানা – ১ নং মহিশীলা কলোনী, অরবিন্দপল্লী মোড়, আসানসোল, জেলা – পশ্চিম বর্ধমান।
দেখার সময় – সকাল ১১ টা থেকে সন্ধ্যা ৭.৩০ মিনিট পর্যন্ত।
টিকিট – ১০০ টাকা
হাত থেকে মোবাইল ফোন বা কোন ভারি জিনিস পরে গিয়ে যদি শিশমহলের কাঁচ ভেঙে যায় তার জন্য ১০০০ টাকা জরিমানা।

 

সুপর্ণা ঘোষ

আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন লেখক-ফোটোগ্রাফার সুপর্ণা ঘোষ দীর্ঘদিন ধরে বহু নামজাদা ম্যাগাজিনে লিখেছেন। কবিতার জন্য পরপর দু’বার পেয়েছেন ইন্টারন্যাশনাল লাইব্রেরি অফ পোয়েট্রি (আমেরিকা)-র আউটস্ট্যান্ডিং এ্যাচিভমেন্ট পুরস্কার। ইন্টারন্যাশনাল লাইব্রেরি অফ ফোটোগ্রাফি থেকে পেয়েছেন গোল্ড ব্রোচ। NASA-র পেজ-এ তাঁর তোলা ছবি দেখা যায়। স্বীকৃতি পেয়েছেন ইংল্যান্ড-এর রাজপরিবার থেকে, রাণী এলিজাবেথ পাঠিয়েছেন শুভেচ্ছাবার্তা। ফোটোগ্রাফির জন্য সম্মানিত হয়েছেন রাশিয়াতেও। দুর্গাপুরের মেয়ে সুপর্ণার স্কুল-কলেজ-বেড়ে ওঠা ওই শহরেই। বেশ কিছুদিন কাটিয়েছেন কানাডায়। এখন কলকাতার বাসিন্দা।

]]>
https://glocalcharcha.in/2022/01/24/momer-desh-aar-kaancher-rajyo/feed/ 8
নারায়ণ দি গ্রেট https://glocalcharcha.in/2022/01/19/narayan-the-great/ https://glocalcharcha.in/2022/01/19/narayan-the-great/#comments Wed, 19 Jan 2022 10:27:16 +0000 https://glocalcharcha.com/?p=3261

তরুণকান্তি বারিক’এর কলমে

১।

বাঁটুল দি গ্রেট। এই নামটার, বলা ভাল, এই চরিত্রটির সঙ্গে পরিচয় সেই কোন ছেলেবেলায়। থাকতাম গ্রামে। বাড়িতে আসত নানা ধরনের পত্রপত্রিকা। সে বয়সে সবগুলো হাতে নেবার অনুমতি ছিল না। যেগুলো হাতে আসত তাদের মধ্যে শুকতারা ছিল অন্যতম। আর পাতা উলটে সবার আগে যেটা পড়তাম সেটা ছিল বাঁটুল দি গ্রেট। তারপর হাঁদা-ভোঁদা। লেখা আর ছবির একেবারে শেষে থাকত একটা ছোট্ট সই— না। না টা এমনভাবে লেখা মনে হতো সেটাও একটা ছবি। এই ‘না’ হলেন নারায়ণ দেবনাথ।

বাঁটুল আর নারায়ণ দেবনাথ একাকার হয়ে গেলেন আমার কাছে। সে বয়সে এত তো বোঝার ক্ষমতা ছিল না। অসম্ভব একটা আকর্ষণ অনুভব করতাম। অপেক্ষা করে থাকতাম পরের সংখ্যার জন্য।

আমার প্রথম আঁকার ইচ্ছেও জাগে বাঁটুলকে দেখে। ছবিগুলো দেখে কপি করতাম। আর একটা কাজ হত, না হারার জেদ তৈরি হত। বাঁটুল যেমন অনায়াস জিতে যায় সবকিছুতে!

জীবনের অনেকটা পথ পেরিয়ে বুঝলাম কী অসম্ভব দক্ষতা তাঁর। তিনি শুধু ছবি আঁকছেন না, লিখছেন গল্পও। নিত্য নতুন। টের পেতে থাকলাম ছোটদের মনের হদিশ তাঁর হাতের মুঠোয়। তাঁর মধ্যেও ছিল এক শিশু মন। না হলে এমন সৃষ্টি সম্ভব হত না। তাঁর ছবি-লেখা কখনও শিশুমনকে বিপথে চালিত করেনি। যেটা অনেক শিশুসাহিত্যিক ভুলে যান।

২।
বেশ কিছু বছর আগে একটি ব্যবসায়িক সংস্থার জন্য বসে আঁকো প্রতিযোগিতার পরিকল্পনার সময় বিচারক কারা হবেন ভাবতে গিয়ে তাঁর কথা মাথায় আসে। যোগাযোগ করি। পৌঁছই তাঁর শিবপুরের বাড়িতে। তিনি তখন তাঁর কাজের টেবিলে বসে আঁকছিলেন। বাঁটুল দি গ্রেট। চোখের সামনে এমন দৃশ্য আমাকে বাক রুদ্ধ করে দিল। একটা ছোট্ট ঘর, ঘরের একদিকে একটা খাট। দরজা দিয়ে ঢুকলেই তাঁর কাজের টেবিল। আমি দরজায় ঠায় দাঁড়িয়ে। তিনি ইশারা করে বসতে বললেন। আঁকা থামালেন। আমার ঘোর কাটছে না। তিনি জানতে চাইলেন আসার কারণ।

বললাম আমাদের পরিকল্পনার কথা। আমি ঠিক করেছিলাম সাধারণত যেভাবে বসে আঁকো হয় সেভাবে না করে শিশুসাহিত্য থেকে পাঠ করে শোনানো হবে, সেটা শুনে ছোটদের যা মনে হবে তাই তারা আঁকবে। আমি চেয়েছিলাম গতানুগতিক যেভাবে ছোটরা শিখে আসে সেটা ভাঙতে। একই ছবি বারবার অভ্যাস করলে দক্ষ কারিগর হয়ে ওঠা যায় কিন্তু শিল্পী হতে গেলে কল্পনাশক্তির প্রয়োজন। তিনি খুশি হলেন। সম্মতি দিলেন। এলেন।

এমন সহজ মানুষ দুটি দেখিনি। তারপর বেশ কয়েকবার তাঁর কাছে আসার সুযোগ হয়েছে। সে স্মৃতি আজীবন বয়ে বেড়াব।
নারায়ণ দেবনাথ, আজও আমার কাছে এক স্বপ্নের নাম। তাঁর সৃষ্টির প্রতি আমার অমোঘ টান আমৃত্যু বয়ে বেড়াব। এর থেকে বেশি বলার যোগ্যতা নেই আমার। প্রণাম।

তরুণকান্তি বারিক

পড়াশোনা বিজ্ঞান নিয়ে। অনুরাগ সাহিত্যে। দীর্ঘদিন 'উড়োজাহাজ' শিশুপত্রিকার সম্পাদনা করেছেন। কাজকর্ম বিজ্ঞাপনের ছবি আঁকা-লেখা আর ছবি বানানো । বয়স ষাট পেরোল।

]]>
https://glocalcharcha.in/2022/01/19/narayan-the-great/feed/ 3
দেউলগ্রাম পাথরা https://glocalcharcha.in/2022/01/03/deulgram-pathra/ https://glocalcharcha.in/2022/01/03/deulgram-pathra/#comments Mon, 03 Jan 2022 03:27:22 +0000 https://glocalcharcha.com/?p=3237

সুমন হাইত’এর কলমে

আর্ট ডিরেকশন : প্রসেনজিৎ বেরা

নাগরিক ব্যস্ততা আর যান্ত্রিক রুটিনে যখন শরীর, মন সবই জেরবার তখন কেবলই মনে হয় এক ছুট্টে কোথাও একটা চলে যেতে। অন্তত কয়েক ঘণ্টার ফুরসতেও ফুরফুরে হতে চায় দেহ নামক এই জৈবিক যন্ত্রটি।

এমনই এক ব্যস্ততাকে একদিনের জন্য বিশ্রাম দিয়ে বছরখানেক আগে প্রতাপদা, বুবুন আর বিমলকে সঙ্গী করে বেড়িয়ে এসেছিলাম পাথরা।

বড় পাথর চাপা কপাল এই পাথরা’র। শুভানুধ্যায়ীদের পা খুব একটা পড়ে না এ পথে। নাহলে কি নেই পশ্চিম মেদিনীপুরের এই দেউল গ্রামে! কাঁসাই এর তীরের চোখ জুড়ানো সৌন্দর্য, ইতিউতি ইতিহাসের হাতছানি, গোটা গ্রাম জুড়ে অপরূপ কারুকার্যের টেরাকোটা মন্দিরের ছড়াছড়ি…. সব যেন ছবির মতো করে সাজানো। অথচ তা যথোপযুক্ত রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ও সরকারী উদাসীনতায় ক্রমশ বিনষ্ট হওয়ার মুখে।

বাংলার আনাচে কানাচে লুকিয়ে থাকা এরূপ মণিমুক্তগুলি চিরদিনই লোকচক্ষুর অন্তরালে থেকে গেছে। পর্যটকদের কাছে উন্মোচিত হতে পারে নি। অথচ এই রকমই পাথুরে স্থাপত্য প্রত্যক্ষ করতে আমরা কত টাকা ব্যয় করে, মূল্যবান সময় অতিবাহিত করে দেশ বিদেশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ধেয়ে যাই! আর পাথরা’র মতো বিস্ময়কর পুরাকীর্তিগুলি দুয়োরানির মতো ব্রাত্যই রয়ে যায় দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর। উপেক্ষা আর বঞ্চনা ব্যতীত কিছুই জোটে না কপালে। এ যেন বুকভরা একরাশ অভিমান নিয়ে কালের গর্ভে বিলীন হওয়ার পথে ধীরে ধীরে অগ্রসর হওয়া।

জনপ্রিয় এক বাংলা ট্রাভেল ম্যাগাজিনে ছবি দেখেই ঠিক করেছিলাম এবার ছোট্ট ছুটিতে পাথরা প্রত্যক্ষ করার।
দূরত্ব আহামরি নয়। মেদিনীপুর রেল স্টেশন থেকে মেরেকেটে ১০-১১ কিমি। আমরা তো দিব্যি ঘুরে এলাম টোটো করে। এই অপেক্ষাকৃত ধীর গতির যানে সওয়ার হওয়ার সুবাদে চারিপাশের খোলামেলা পরিবেশকে আরো ভালোভাবে পর্যবেক্ষণের সুবিধা মেলে।

পাথরা’র নামকরণে দ্বিমত মেলে। পাথরাকীর্ণ থেকে এই গ্রামের নাম হয় পাথরা। চারিপাশে পাথরের ছড়াছড়ি বা প্রস্তরখন্ডের আধিক্য দেখে নামকরণের স্বার্থকতা দিব্যি মালুম হয়।
নামকরণের দ্বিতীয় তত্ব ইতিহাস বিজড়িত।
সে বেশ পুরানো আমলের কথা। আনুমানিক ১৭৩২ খ্রিস্টাব্দের কাছাকাছি নবাব আলীবর্দী খাঁ তাঁর এক মুসমাদার বা নায়েব বৈদ্যনাথ ঘোষাল ওরফে দয়ানন্দকে দায়িত্ব দেন স্থানীয় রতনচক পরগণার কর আদায়ের। এদিকে রাজস্বের টাকা হাতে পেয়ে সেই অর্থে এক মন্দির নির্মাণের কাজ শুরু করে দেন ধার্মিক দয়ানন্দ। খবর পেয়ে নবাবের মাথা আগুন। সাথে সাথে জরুরী তলব। পাগলা হাতির পায়ে পিষে ফেলার দন্ড দেন দয়ানন্দকে।
রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষারত জনতাকে অবাক করে বধ্যভূমে নিশ্চল থাকে হাতি। ঘটনার আকস্মিকতায় সকলেই হতবাক। বিস্মিত নবাব এরপর নিঃশর্ত মুক্তি দেন দয়ানন্দকে।
হাতির পা থেকে বাঁচা বা পা- উৎরা থেকে পাথরা নামের সৃষ্টি বলেই অনেকের ধারণা।
শোনা যায়, এরপরই রতনচকের জমিদারী পেয়ে একের পর এক বিভিন্ন আদলের মন্দির তৈরি করেন দয়ানন্দ।

প্রায় আড়াই শতক পূর্বে নির্মিত অজস্র মন্দিরের মধ্যে এখন আর অবশিষ্ট রয়েছে ৩২-৩৪ টি। তাদের অবস্থাও তথৈবচ।
মূলত এটেল মাটি পুড়িয়েই নির্মিত হয়েছে মন্দিরগুলি। প্রতিটি মন্দিরের কারুকাজ পৃথক ও বিস্ময় উদ্বেককারী। বেশীর ভাগ দেউলই অধুনা বিগ্রহশূন্য। কিছু মন্দির আছে গ্রামের ভিতরে। বাকিগুলি কাঁসাইয়ের তীরে।
পুরাতত্ত্ববিভাগ কেবল নিয়মরক্ষার্থে তাদের বিজ্ঞপ্তি ঝুলিয়ে দায়িত্ব সেরেছে। ইতিমধ্যেই নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে বেশ কিছু মন্দির। বাকিগুলিও প্রহর গুনছে। এভাবে চলতে থাকলে কয়েক বছরের মধ্যেই অনিন্দ্যসুন্দর এই দেউলগ্রাম দেউলিয়া হয়ে যাবে।

এই ভাঙ্গন ও ক্ষয়ের মাঝেও সাধ্যমত প্রচেষ্টা চালিয়ে মন্দির রক্ষার গুরুদায়িত্ব স্বেচ্ছায় কাঁধে তুলে নিয়েছেন শ্রদ্ধেয় মহম্মদ ইয়াসিন। মূলত তাঁরই উদ্যোগে ও তৎপরতায় গঠিত হয়েছে এক মন্দির সংরক্ষণ কমিটি।

শুধু বিস্মরণ আর রোমন্থনের আজব পুরাকীর্তিই নয়, পাথরা আপনাকে মুগ্ধ করবে অসামান্য প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কারণেও। গাঁয়ের গা ঘেঁষে বয়ে যাওয়া সুন্দরী কাঁসাই ও তার দুই পাড়ের প্রাকৃতিক শোভায় চোখ জুড়াতে বাধ্য।
আশা রাখি, অদূর ভবিষ্যতে এই দেউলপুর তার হারানো শ্রী পুনরুদ্ধার করে আবারো পর্যটকদের নেকনজরে আসবে।

ফেরার পথে চাক্ষুষ করলাম পবিত্রভূমি হাবিবপুর। এখানেও ইতিহাসের হাতছানি।
আদতে সমগ্র মেদিনীপুরই ইতিহাস বিজড়িত। বিশেষত স্বাধীনতা সংগ্রামের সাথে এই জেলার সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড়। এতো বিপ্লবীদের পীঠস্থান। অগুন্তি বীর সন্তানের স্মৃতি পরতে পরতে জড়িয়ে আছে জেলার বিভিন্ন প্রান্তে।
অগ্নিযুগের এমনই এক বীর বিপ্লবী ক্ষুদিরাম বসুর জন্মভিটে এই হাবিবপুর।
সরকারী হস্তক্ষেপে বর্তমানে এই বসতবাড়িটির আমূল সংস্কার হয়েছে। তবুও ইতিহাস প্রত্যক্ষ করার ও তার সাথে একাত্ম হওয়ার মজাই আলাদা।
শহীদ ক্ষুদিরামের জন্মভিটের ঠিক বিপরীতেই রয়েছে সুদর্শন সিদ্ধেশ্বরী কালীমন্দির। কথিত, এই মাতৃ মন্দিরেই দীক্ষা নিয়ে দেশ মাতৃকার জন্য জীবন উৎসর্গ করার শপথ নেন কিশোর ক্ষুদিরাম। স্বাধীনতার জন্য বীর ক্ষুদিরামের আত্মত্যাগের স্মৃতিচারণে সারা শরীর জুড়ে শিহরণ জাগে।

তাই বলি কি, আর অপেক্ষা কিসের? সময়, সুযোগ বের করে কয়েক ঘণ্টার জন্য ঘুরেই আসুন না পাথরা, হাবিবপুর। ইতিহাস চাক্ষুষ করার এমন সুবর্ণ সুযোগ কি হেলায় হারানো যায়???

সুমন হাইত

স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার সময় সেভাবে লেখার অভ্যাস বা অবকাশ কোনোটাই হয়ে ওঠে নি। এরপর চাকরি খোঁজার মরিয়া প্রচেষ্টায় পরের কয়েক বছর পার। স্কুল শিক্ষক হিসেবে কর্মরত হওয়ার পরে অল্পস্বল্প লেখার অভ্যাস তৈরি হয়। তাও অবরেসবরে। প্রতিদিন নিয়ম করে পেন, খাতা নিয়ে বসার অভ্যাস আজও ঠিকমতো গড়ে তুলতে পারলাম না। না, এর জন্য সময়কে কাঠগোড়ায় না তুলে অভিযুক্ত করবো নিজে চপল মানসিকতাকে। তার অর্থ ওই….. ভালো লাগলে লিখি, আর না লাগলে লিখি না। ব্যাস, এটুকুই। আর এটুকুতেই যদি কিছু পাঠকের মনে ছাপ ফেলতে পারি, তবে সে আমার পরম প্রাপ্তি। পাঠকের স্বস্তি ও আশীষই তো এক উঠতি লেখকের সম্বল। তাকেই পাথেয় করে এগোতে চাই, আমি, সুমন হাইত।

]]>
https://glocalcharcha.in/2022/01/03/deulgram-pathra/feed/ 4
Traditional Santhali Folk Dance https://glocalcharcha.in/2021/12/27/traditional-santhali-folk-dance/ https://glocalcharcha.in/2021/12/27/traditional-santhali-folk-dance/#comments Mon, 27 Dec 2021 17:20:50 +0000 https://glocalcharcha.com/?p=2960

Indian Performative traditions documented by Rohit Dutta Roy

Artify is a repository of Indian performative traditions.

This is a traditional folk dance performed by the Santal/Santhals of Bankura. The Adivasi group resides throughout the Chota Nagpur Plateau region of India, which includes parts of Jharkhand, West Bengal, Bihar, Orissa and Assam.

Lars Olsen Skrefsrud, a Norwegian Lutheran Missionary and Linguist, was the first to attempt a Santhali dictionary. He, however, could not complete it, and handed over his life’s work to fellow missionary Paul Olaf Bodding in 1903. Bodding continued the monumental work, and finally the dictionary, 69 years in the making, was published over eight years, between 1929 to 1936.
This video is as much a tribute to Skrefsrud and Bodding, as to Khudu, Biram Hansdak, Sagram Murmu and Mongol, Skrefsrund’s Santhal collaborators.
Let us leave you with the words of Bodding, one of the compilers of A Santal Dictionary, in praise of the Santhali dance.: “It often happens, that Europeans who have no idea of this, and who enjoy the plastic movements of the people, call for Santals to dance before them…”

We hope the rhythms and movements would be as immersive an experience for you, as it was for us.

Rohit Dutta Roy

Rohit Dutta Roy is a Doctoral scholar at the Faculty of History, University of Cambridge. He began his doctoral research at Cambridge after completing an MPhil in Modern History from the Centre for Historical Studies, Jawaharlal Nehru University. Rohit has First Class BA and MA degrees in Comparative Literature from Jadavpur University, and a First Class Master’s in History from the University of Delhi. His stories on politics and policy have appeared in The Wire, Newslaundry and The Citizen. Rohit writes on the everyday political, policy history, identity formation and governmentality.

]]>
https://glocalcharcha.in/2021/12/27/traditional-santhali-folk-dance/feed/ 3
পাথরের কথা : Stone Carvers of Susunia https://glocalcharcha.in/2021/12/27/stone-carvers-of-susunia/ https://glocalcharcha.in/2021/12/27/stone-carvers-of-susunia/#comments Mon, 27 Dec 2021 16:38:55 +0000 https://glocalcharcha.com/?p=2941
Indian Craft Traditions & Working class cultures documented by Rohit Dutta Roy

শুশুনিয়ার কথা শুনুন – বাঁকুড়ার পাথর-শিল্পীদের কাজ

শুশুনিয়া পাহাড়ের কোল ঘেঁষে ছোট্ট গ্রাম – তারও নাম শুশুনিয়া। অক্টোবরের এক প্রাক-পুজো দুপুরবেলায় প্রবীণ পাথরশিল্পী কানু কর্মকারের সঙ্গে জমে উঠল আলাপ। কথায় কথায় বাংলার নিজস্ব এই পাথরশিল্পের নানা সুলুকসন্ধান দিলেন কানুবাবু । কেমন আছেন শুশুনিয়ার পাথরশিল্পীরা, কী ধরণের কাজের চাহিদা বেড়েছে, কেমন ভাবে কাজ করেন তাঁরা, এমন নানা প্রশ্নের উত্তর দিলেন তরুণ পাথরশিল্পী জয়ন্ত কর্মকার। নিজের ওয়র্কশপ ঘুরে দেখাতে দেখাতে জানালেন বাংলার বহু পুরনো এই ঐতিহ্যের এখনকার অবস্থাটা।
গ্লোক্যাল টেলিভিশন নিবেদিত আর্টিফাই-এর আজকের পর্বে দেখুন শুশুনিয়ার পাথরশিল্প।

Rohit Dutta Roy

Rohit Dutta Roy is a Doctoral scholar at the Faculty of History, University of Cambridge. He began his doctoral research at Cambridge after completing an MPhil in Modern History from the Centre for Historical Studies, Jawaharlal Nehru University. Rohit has First Class BA and MA degrees in Comparative Literature from Jadavpur University, and a First Class Master’s in History from the University of Delhi. His stories on politics and policy have appeared in The Wire, Newslaundry and The Citizen. Rohit writes on the everyday political, policy history, identity formation and governmentality.

]]>
https://glocalcharcha.in/2021/12/27/stone-carvers-of-susunia/feed/ 2
Conversation with Reazul Hasnat on the 50th year of Bangladesh’s Independence , Part 2 https://glocalcharcha.in/2021/12/19/conversation-with-reazul-hasnat-on-the-50th-year-of-bangladeshs-independence-part-2/ https://glocalcharcha.in/2021/12/19/conversation-with-reazul-hasnat-on-the-50th-year-of-bangladeshs-independence-part-2/#comments Sun, 19 Dec 2021 12:26:47 +0000 https://glocalcharcha.com/?p=2915

বিজয় দিবস ও অর্ধশতকের বাংলাদেশ: রিয়াজুল হাসনাত-এর সঙ্গে একটি কথোপকথন…দ্বিতীয় পর্ব

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন অরিন্দম লাহিড়ী

On the ocassion of the 50th year of Liberation war (Muktijuddho) for Independent Bangladesh, Glocal Charcha spoke to Mr. Reazul Hasnat from Mymensingh, Bangladesh. Mr. Hasnat is a grassroots political organiser, civil society activist and former student leader. In the first part of this GloCal Charcha conversation Mr. Hasnat reminisces the days leading up to the Victory Day and discusses various aspects of Bangladeshi experience over the past few decades.

অরিন্দম লাহিড়ী

Arindam Lahiri is a postgraduate in Comparative Literature from Jadavpur University, and a copywriter by profession. He started his advertising career seven years ago at Ogilvy. Since then, Arindam has worked in major campaigns for brands like Anandabazar Patrika, Star Jalsha, Fevicol, Eno, Pantaloons, Asian Paints, Vodafone, Amazon and Tata Sky. He writes on politics and the culture industry.

]]>
https://glocalcharcha.in/2021/12/19/conversation-with-reazul-hasnat-on-the-50th-year-of-bangladeshs-independence-part-2/feed/ 4
Conversation with Reazul Hasnat on the 50th year of Bangladesh’s Independence https://glocalcharcha.in/2021/12/17/glocal-charcha-dialogues-conversation-with-reazul-hasnat-on-the-50th-year-of-bangladeshs-independence/ https://glocalcharcha.in/2021/12/17/glocal-charcha-dialogues-conversation-with-reazul-hasnat-on-the-50th-year-of-bangladeshs-independence/#respond Fri, 17 Dec 2021 17:45:09 +0000 https://glocalcharcha.com/?p=2911

বিজয় দিবস ও অর্ধশতকের বাংলাদেশ: রিয়াজুল হাসনাত-এর সঙ্গে একটি কথোপকথন…প্রথম পর্ব

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন অরিন্দম লাহিড়ী

On the ocassion of the 50th year of Liberation war (Muktijuddho) for Independent Bangladesh, Glocal Charcha spoke to Mr. Reazul Hasnat from Mymensingh, Bangladesh. Mr. Hasnat is a grassroots political organiser, civil society activist and former student leader. In the first part of this GloCal Charcha conversation Mr. Hasnat reminisces the days leading up to the Victory Day and discusses various aspects of Bangladeshi experience over the past few decades.

অরিন্দম লাহিড়ী

Arindam Lahiri is a postgraduate in Comparative Literature from Jadavpur University, and a copywriter by profession. He started his advertising career seven years ago at Ogilvy. Since then, Arindam has worked in major campaigns for brands like Anandabazar Patrika, Star Jalsha, Fevicol, Eno, Pantaloons, Asian Paints, Vodafone, Amazon and Tata Sky. He writes on politics and the culture industry.

]]>
https://glocalcharcha.in/2021/12/17/glocal-charcha-dialogues-conversation-with-reazul-hasnat-on-the-50th-year-of-bangladeshs-independence/feed/ 0
পরিশেষে https://glocalcharcha.in/2021/12/16/porisheshe/ https://glocalcharcha.in/2021/12/16/porisheshe/#comments Thu, 16 Dec 2021 14:35:55 +0000 https://glocalcharcha.com/?p=2906 জুয়েল খান’এর কলমে

অলঙ্করণে – সুমিত দাস

১।

রাত হয়েছে ন’টার মতো। ট্রেন ছাড়তে এখনও প্রায় মিনিট কুড়ি বাকি। একটু আগে ষ্টেশনে এসে না পৌঁছানোর ফলে এর আগেও তিনবার ট্রেন ধরতে না পারার স্মৃতি এখনও বেশ সতেজ, তাই তাড়াহুড়ো করেই এবার আগে এসে অপেক্ষা করা।

কেউ একজন ডাকল মনে হচ্ছে। পিছনে ফিরে তাকাতেই একজন বয়স্ক লোককে চোখে পড়ল। বয়স পঁচাত্তর-আশি তো হবেই। চশমার ভাঙ্গা ফ্রেমের ভেতরে দুটো ক্লান্ত চোখের ঝাপসা চাহনি। কাছে গিয়ে জানতে চাইলাম “চাচা ডেকেছেন আমায়”? বার্ধক্যের ভারে কেঁপে কেঁপে উঠা শরীর নিয়ে ভাঙ্গা ফ্রেমের ভেতরে থাকা দুটো ক্লান্ত চোখ আমার দিকে রেখে বললেন ” হুম”।

  • জ্বি বলুন..
  • পত্রিকা লাগবে আপনার?
  • জ্বি না।
  • চা খাবেন?
  • হুম, চা খাওয়া যেতে পারে।

তিনি সামনে থাকা ফ্লাস্ক থেকে কাপে চা নিলেন। দেখলাম, পাশেই ঝুলতে থাকা পলিথিন থেকে এক টুকরো লেবু নিয়ে তিন আঙ্গুল দিয়ে চাপছেন।পুরো হাত কাঁপছে বয়সের ভারে থরথর করে। খুব মায়া হল। বললাম, “চাচা, আমি লেবু খুব একটা খাইনা।“

তিনি চায়ের কাপ আমাকে দিয়ে বললেন, “বাবা পত্রিকা লাগবে?” বললাম, “দিন একটা।“ তারপর চায়ে চুমুক দিতে দিতে আরও বললাম, “চাচা একটা কথা জিজ্ঞেস করি…?”

  • জ্বি বাবা করেন।
  • আপনি এ বয়সে এমন অসুস্থ শরীর নিয়ে কেন চা/ পত্রিকা বিক্রি করছেন? আপনার ছেলে মেয়ে নেই?

ভদ্রলোক চুপ করে থাকলেন কিছুক্ষণ। বললাম, “চাচা, আপনি কি কিছু মনে করেছেন আমার কথায়?”

তিনি কিছুই বললেন না। এবারও চুপ করেই থাকলেন। বুঝতে বাকি রইল না, তিনি এমন প্রশ্নে কিছুটা বিব্রতবোধ করেছেন। তাই ক্ষমা চেয়ে পত্রিকার দাম আর চায়ের বিল মিটিয়ে যে’ই উঠেছি, তিনি ডেকে বললেন, “বাবা এই ট্রেনে আপনি যাবেন না।“
একটু হকচকিয়ে বললাম, “মানে?”

তিনি তাঁর চায়ের ফ্লাস্ক এবং অবিক্রীত পত্রিকাগুলো গোছাতে লাগলেন। আমি আবার জানতে চাইলাম, “এই ট্রেনে কেন আমাকে যেতে নিষেধ করছেন?” তিনি কিছুই বললেন না। কপালে কিঞ্চিৎ ভাঁজ পড়ল আমার। তিনি বোধহয় সেটা খেয়াল করলেন, তাই বললেন, “ষ্টেশন থেকে আপনার বাড়ি কি বেশি দূর?” বললাম, “কেন?”

তিনি বললেন, “ইচ্ছে করলে বাবা আপনি আমার বাড়িও রাতটা থেকে যেতে পারেন,আমার বাড়ি খুব একটা দূরে নয়.. ঐ যে বাজার পেরুলেই বাড়ি…”, বলেই তিনি হাঁটতে শুরু করলেন। এত রাতে কী যে করব, বুঝতে পারছিলাম না। গ্রামের পাশের ষ্টেশনগুলো সন্ধ্যার পর থেকেই কেমন ভূতুরে হতে শুরু করে এবং এটাও তার ব্যতিক্রম নয়।

২।

কি বুঝে যেন, ভদ্রলোকের বাড়িতে উঠলাম গিয়ে সেই রাতদুপুরে। শীর্ণ এক পুরোনো জনশূন্য বাড়ি সে বাড়িতে তিনি ছাড়া দ্বিতীয় কেউ নেই। টিউবওয়েল চেপে হাতমুখ ধুয়ে এসেই দেখি তিনি পাটি বিছিয়ে রাতের খাবারের আয়োজন করলেন। জিজ্ঞেস করলাম, “বাড়িতে আর লোকজন কোথায়?” বললেন, “আমি ছাড়া আমার আর কেউ নেই।“ কথা বাড়ালাম না। কেমন যেন লাগছে নিজের মধ্যে। খাওয়া শেষ করতেই আমার বিছানা দেখিয়ে তিনি বললেন, “ভালো ঘুম দিবেন। সকালে আমি ডেকে নিব।“

শুয়ে-বসে রাত কাটাব এমন সিদ্ধান্ত নিলাম। কিছুক্ষণ পরে, তিনি এসে জানতে চাইলেন, ঘুমিয়েছি কিনা? বললাম, “চাচা আসেন।“ তিনি বসলেন এবং নিজ থেকেই বললেন, “আমার নাম মহিদুল।“ এরপর…

তিন ভাই ও এক বোন ছিলেন তারা। বাবা মা দু’জনেই প্রাইমারি স্কুলে শিক্ষকতা করতেন। ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে তিনি সব হারিয়েছেন। খেয়াল করলাম, তাঁর চোখ ভিজতে শুরু করেছে। বললেন, “আমার বয়স তখন ২৬। ভাই-বোনদের মধ্যে আমি সবচেয়ে বড়। টাউন কলেজ থেকে সবেমাত্র বি.কম পাশ করেছি জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে। মার্চ মাস থেকে হঠাৎ দেশে যুদ্ধ শুরু হল।“

তাঁর পরিস্কার মনে আছে, বাবা মহিউদ্দিন সাহেব ও মা দিলারা জামানের সাথে মেজভাই মবিন ও ছোটবোন মুন্নী-সহ সবাই মিলে তাঁরা বাড়ির উঠোনে বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ শুনেছিলেন। বাবার চোখেমুখে দেখেছিলেন তীব্র উত্তেজনা। মহিউদ্দীন সাহেব বারবার বলছিলেন, “এবার কিছু একটা হবেই হবে।“

খালাতো বোন মিতুর সাথে মুহিদুল সাহেবের বিয়ের কথা সম্পূর্ণ ঠিক করা ছিল। খালা খালু মারা যাওয়ার পর থেকেই মিতু মহিদুল সাহেবদের বাড়িতেই বড় হয়েছে। তাই মা দিলারা জামান বোনের মেয়েকেই ছেলের বউ করে চেয়েছিলেন।

কিন্তু ২৫শে মার্চের পর থেকেই সব এলোমেলো হয়ে পড়ল। মহিদুল সাহেব কিছুক্ষণ থামলেন। তারপর আবার বলতে শুরু করলেন…

“ছোটো ভাই মাজেদের বয়স তখন উনিশ ছিল। মাজেদই প্রথম আমাকে যুদ্ধে যাওয়ার কথা বলে। বাবা কোনও আপত্তি করলেন না। বরং বললেন, যদি দেশ ও দশের তরেই না লাগে জীবন, তবে মনুষ্যত্বের কি দাম থাকে আর…”

আগ্রহ, উত্তেজনা, আবেগ ও দেশপ্রেম বুকে ধারণ করেই সেদিন যুদ্ধে গিয়েছিলেন দু’ভাই। গ্রামে এ খবর ছড়িয়ে পড়ে বিদ্যুৎবেগে। ফলস্বরূপ তীব্র রোষানলে পড়তে হয় তাদের পরিবারের সবাইকেই। একদিন রাতে পাকবাহিনী হানা করে বাড়িতে। কে বা কারা পাকসেনাদের মিথ্যে খবর দিয়েছিল যে, মহিদুল আর মাজেদ-সহ আরও কিছু মুক্তিসেনা ওই বাড়িতেই আছে।

পুরো বাড়ি ঘেরাও করল পাকসেনার প্রতিনিধিরা। মহিদুল ও মাজেদকে না পেয়ে বাড়ির বাকি সকলের ওপর চলল অমানুষিক সব নির্যাতন। বাবা ও মাকে বাড়ির উঠোনে এনে ব্রাশ-ফায়ার করা হয়। বোন মুন্নী ও খালাতো বোন মিতুকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয় পাক ক্যাম্পে। তারপর আর তাদের খোঁজ মেলেনি।

৩।

মহিদুল সাহেব আবার থেমে গেলেন কিছুক্ষণের জন্য। আমি কাছে এসে হাত ধরতেই বললেন, ‘ “মাজেদকে আমি আমার চোখের সামনেই গুলি খেয়ে শহিদ হতে দেখেছি। কিন্তু যুদ্ধ-শেষে বাড়ি ফিরে এসেছি স্বাধীনতা নিয়ে, নিজের দেশের, বাংলাদেশের পতাকা নিয়ে। আর সেই থেকে এই বাড়িতে আর কাউকে দেখিনি”।
বললাম, “আপনি আর বিয়ে করেননি?”
বললেন, “মিতুকে খুব ভালোবাসতাম জানেন বাবা। তাই আর কাউকে বিয়ে করে সংসার পাততে ইচ্ছে করেনি।“

তখন বাংলাদেশ জুড়ে গভীর রাতের অন্ধকার নেমেছে। জানলার বাইরের, সেই অন্ধকারের দিকে চেয়ে বললাম, “সরকারি কোনো চাকরিতে কেন যোগ দেননি? আপনি মুক্তিযোদ্ধা। আপনি…” মাঝপথে কথা থামিয়ে উত্তর দিলেন, “স্বাধীনতাই চেয়েছিলাম, চাকরি না।“

  • কোনও আক্ষেপ আছে আপনার চাচা?
  • আক্ষেপ নেই, তবে অপেক্ষা আছে।
  • কিসের অপেক্ষা?
  • প্রকৃত বিজয়ের।

টের পাইনি, কখন সকাল হয়ে গেছে। বাড়ি থেকে বের হলাম, এক-পৃথিবী ঘোর নিয়ে। ষ্টেশনে পৌঁছেই জানতে পারলাম, আজ কোনও ট্রেন চলাচল নেই। কারণ জানতে গিয়ে জানলাম, গত রাতের শেষ ট্রেনটি আখাউড়া ষ্টেশনে গিয়ে লাইনচ্যুত হয়েছে এবং ব্যাপক হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। কিছুক্ষণের জন্য থমকে গেলাম, কারণ এই ট্রেনেই কাল আমার ঢাকা পৌঁছানোর কথা ছিল।

]]>
https://glocalcharcha.in/2021/12/16/porisheshe/feed/ 4
‘স্ব-শক্তি হোমের’ কন্যারা https://glocalcharcha.in/2021/12/04/swashokti-homer-konyara/ https://glocalcharcha.in/2021/12/04/swashokti-homer-konyara/#comments Sat, 04 Dec 2021 22:10:06 +0000 https://glocalcharcha.com/?p=2869
সুপর্ণা ঘোষের কলম ও ক্যামেরায়

আর্ট ডিরেকশন : প্রণয় সাহা 

বেশ কিছুটা সময় কাটিয়েছিলাম ওদের সাথে, এই বছর ( ২০২১) দুর্গাপূজোর সপ্তমীর দিন। ওরা মানে আসানসোলের “স্ব-শক্তি স্বধারগৃহ” হোমের (পরিচালনায় জয়প্রকাশ ইনস্টিটিউট অফ সোস্যাল চেঞ্জ, সহায়তায় নারী ও শিশু বিকাশ ও সমাজ কল্যান দপ্তর, পশ্চিমবঙ্গ সরকার) মিষ্টি সব কন্যাদের সাথে। সত্যি ওদের দেখে প্রথমেই মনে হয়েছিল বেশ সার্থকনামা তো! প্রতিটি কন্যা ছোট্ট থেকে বড় সব্বাই স্ব-শক্তিকে ভরপুর। হোম কন্যাদের যিনি দেখাশুনা করেন মানে সুপারিন্টেন্ডেট নাম সেরিনা, আলাপ হল তার সাথেও, সপ্রতিভ, মিষ্টভাষী, করিৎকর্মা। কন্যারা তাকে শ্রদ্ধাও করে ভালবাসেও। পরিবার না পাওয়া কিছু কন্যারা একসাথে থাকে এখানে ঠিক একটি পরিবারের মত। আমরা যেতে তাই আমাদের আদর আপ্যায়নের কোন রকম ত্রুটি পাইনি। সদা হাস্যময়ী কন্যারা খুব গুণবতীও বটে। নাচ, গান, আবৃত্তিপাঠ, হাতের কাজ আরও কত কিছু। ওদের সুমিষ্ট ব্যবহার ও হাসিখুশি থাকা দেখে আমরা বুঝেছি যারাই এই হোমের সম্পূর্ন দেখাশুনায় আছেন বিভিন্ন দিকে, তারা সত্যিই আপ্রাণ চেষ্টা করছেন ওদের ভালো রাখার। সবার নাম উল্লেখ করলাম না আর আলাদা করে, তবে কথা হল ফোনে হোমের কাউন্সিলার সাহারা মন্ডলের সাথে। সাহারার থেকে জানলাম অসম্ভব এক মন ছুঁয়ে যাওয়া বিষয়। এই হোমের আটজন কন্যার বিয়ে দিয়েছেন এঁরা খুব সুন্দর ভাবে,পাশে পেয়েছেন বহু সুজনকে, যারা এই সুন্দর উদ্যোগের সাথে জুড়ে গেছেন। সেই কন্যারা আজ সুনামের সাথে সংসার করছে! সত্যি তো বড় আনন্দের। আসলে ওদের জীবন যেখানে প্রায় অন্ধকারে ছিল, এই হোমটিতে এসে যেখানে ওরা আলোর সন্ধান পেয়েছে সেখানে ওরা যে অন্য সংসারে গিয়ে আলো বিচ্ছুরণ করবেই তা তো স্বাভাবিক।

        কন্যাদের যার যেটা গুণ তুলে ধরার প্রচেষ্টা চলছে এখানে, তা দেখে আমার বেশ ভালো লেগেছে যেহেতু বেশিরভাগ কন্যার পড়াশুনার বয়স উত্তীর্ণ তাই এই প্রচেষ্টা। লক্ষ্য হল সব্বাই যাতে আবার সমাজের মূল স্রোতে ফিরে যেতে পারে। ফিরে আসি আবার কন্যাদের কথায়। ওদের হাতের কাজ দেখে যেমন আমরা অবাক, মুগ্ধ, তেমনই আনন্দে  মন ভরে গেছে ওদের হাতের ভারি সুন্দর রান্না খেয়ে। আমরা যাওয়ায় কন্যারাও ভীষন খুশি – নাচে গানে মাতোয়ারা, এতেই ওদের আনন্দ, এতেই ওদের খুশি উপছে পড়ছে যেন! দেখতে দেখতে ভাবছিলাম এত প্রাণশক্তি ওরা পায় কোথা থেকে যেখানে আমরা খুব অল্পেই কাতর হয়ে যাই! হাজারটা “না-পাওয়া” তে ভরা ওদের জীবন তবুও এই হোমে এসে একটা সুন্দর পরিবার পেয়েছে – তবুও তো কোথাও ওদের মনের গভীরের সুন্দর ইচ্ছাগুলো আর পাখনা মেলে উড়তে পারেনি, থমকে গেছে শুরু হওয়ার আগেই, তবুও এত জীবনীশক্তি! অনেক অনেক অনুপ্রাণিত হলাম আমরা ওদের দেখে, তবে শিখতে পারলাম কতটুকু কেজানে!

         কিছু কথা থাকে যা প্রাণ খুলে কাউকে বলা যায় বড় আপন ভেবে, তা শুধুই শুনতে হয়, অনুভব করার চেষ্টা করতে হয়-তাই ওদের কথাগুলো শুনলাম, চেষ্টা করলাম অনুভব করতে যতটা পারলাম, কিন্ত তা আর লিখলাম না। এগিয়ে চলুক ওরা অফুরন্ত জীবনীশক্তিকে সঙ্গী করে, আমরা বরং অনুপ্রাণিত হই বরং নিজেদের সঙ্কুচিত মনকে প্রসারিত করি আর সমাজের মূল স্রোতে কন্যারা যাতে সঠিকভাবে পদার্পন করতে পারে সেই দিকটায় লক্ষ্য রাখি, কারন আমরা সচেতন না হলে ওদের এই অদম্য লড়াইকে কুর্নিশ জানাতে পারবো না। আবার ওদের কাছে ফিরে যাবই কোন আর একদিন, এই অঙ্গীকার করে, এক সমুদ্র ভাল লাগা নিয়ে বিদায় জানালাম স্ব-শক্তিময়ী সেই কন্যাদের।  

সুপর্ণা ঘোষ

আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন লেখক-ফোটোগ্রাফার সুপর্ণা ঘোষ দীর্ঘদিন ধরে বহু নামজাদা ম্যাগাজিনে লিখেছেন। কবিতার জন্য পরপর দু’বার পেয়েছেন ইন্টারন্যাশনাল লাইব্রেরি অফ পোয়েট্রি (আমেরিকা)-র আউটস্ট্যান্ডিং এ্যাচিভমেন্ট পুরস্কার। ইন্টারন্যাশনাল লাইব্রেরি অফ ফোটোগ্রাফি থেকে পেয়েছেন গোল্ড ব্রোচ। NASA-র পেজ-এ তাঁর তোলা ছবি দেখা যায়। স্বীকৃতি পেয়েছেন ইংল্যান্ড-এর রাজপরিবার থেকে, রাণী এলিজাবেথ পাঠিয়েছেন শুভেচ্ছাবার্তা। ফোটোগ্রাফির জন্য সম্মানিত হয়েছেন রাশিয়াতেও। দুর্গাপুরের মেয়ে সুপর্ণার স্কুল-কলেজ-বেড়ে ওঠা ওই শহরেই। বেশ কিছুদিন কাটিয়েছেন কানাডায়। এখন কলকাতার বাসিন্দা।

]]>
https://glocalcharcha.in/2021/12/04/swashokti-homer-konyara/feed/ 4
রূপসী কাঁকড়াঝোর https://glocalcharcha.in/2021/12/01/ruposhi-kankrajhore/ https://glocalcharcha.in/2021/12/01/ruposhi-kankrajhore/#respond Wed, 01 Dec 2021 14:22:37 +0000 https://glocalcharcha.com/?p=2846

সুমন হাইত’এর কলমে

আর্ট ডিরেকশন : প্রসেনজিৎ বেরা

শুধু আসা-যাওয়া?

হাঁফিয়ে যাচ্ছি মশাই। হাঁফিয়ে যাচ্ছি। আর পারা যাচ্ছে না। কেবলই মনে হচ্ছে করোনা নামক এক আতঙ্ক শরীর মন জুড়ে চেপে বসে আছে। এমনই আষ্টেপিষ্টে জড়ানো শ্বাসরোধী তার বাঁধন যে, তার নাগপাশ থেকে মুক্তি পাওয়া বোধহয় আমার বা আমাদের পক্ষে এজন্মে আর কোনোমতে সম্ভবপর নয়।

যা কিছু করতে যাই, হাজারো বিধিনিষেধের প্রোটোকল এসে হাজির। তার প্রভাব মনের উপরেও পড়তে বাধ্য। এবং তা পড়ছেও। ভাবনারাও স্থবির। চাচা আপন প্রাণ বাঁচা তত্ত্বে বিশ্বাসী আমরা কেবলই ভ্যাকসিন নামক বিশল্যকরণীর সন্ধানে মরীচিকার মতো ধেয়ে চলেছি নিরলসভাবে। শরীরের সাথে তালে তাল মিলিয়ে মনের অবস্থাও ক্রমশ সঙ্গীন।

এভাবে কি বাঁচা যায়, বলুন? কদ্দিন আর এইভাবে মরে মরে বাঁচবো? তাই খানিকটা বেপরোয়া তথা মরিয়া হয়েই ছুটলাম মুক্ত প্রকৃতির কাছে– শরীরের সাথে মনেরও অক্সিজেন জোগান অব্যাহত রাখতে। পাড়ি দিলাম বাংলা- ঝাড়খন্ড সীমানার এক্কেবারে লাগোয়া এক প্রান্তিক গ্রাম– কাঁকড়াঝোরে।

নামকরণের সার্থকতা

নামটা বেশ চমকপ্রদ না! আমি তো নাম শুনেই উৎসের খোঁজে ঢু দিলাম। দেখি, গ্রামের এই অদ্ভুতসুন্দর নামকরণের পিছনে দুই তত্ত্ব হাজির।

প্রথম মতানুযায়ী, কাঁকড়াঝোর শব্দের অর্থ পাহাড় ও ঝর্ণার মিশেল। কারণ স্থানীয় ভাষায় কাঁকড়ার অর্থ পাহাড় এবং ঝোর বা ঝোড় হল জঙ্গল। অপর মতে, এই গ্রামকে পরিবেষ্টন করে আছে যে সকল অনুচ্চ পাহাড়, তাদের গা বেয়ে নেমে আসা ঝোর বা ঝর্ণায় বর্ষায় প্রচুর কাঁকড়া পাওয়া যেত। তাই গ্রামের নাম কাঁকড়াঝোর (ঝোর=ঝর্না)।

প্রথম তত্ত্বের দিকে সংখ্যাগরিষ্ঠের সায় থাকলেও দ্বিতীয় মতকেও একেবারে খারিজ করে দেওয়া চলে না। নামকরণের উৎস নিয়ে দ্বিমত থাকলেও এখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, অনাবিল প্রাণপ্রাচুর্য, অফুরান বৃক্ষ সারির নয়নামাভিরাম দৃশ্য যে আপনাকে মুগ্ধ করবেই এ নিয়ে মতভেদের কোনো জায়গা নেই।

আমাদের যাত্রা হল শুরু

নির্দিষ্ট দিনে সাতসকালে আটজন ভ্রমণ রসিক মিলে আহ্লাদে আটখানা হয়ে দিলাম প্রকৃতি সাগরে ডুব। আর নাইতে যখন হবেই তখন কাকস্নান করে লাভ কোথায়? অবগাহন ব্যতীত দ্বিতীয় কোনো রাস্তায় হাঁটবোই না। অতএব,দিন দুয়েকের নিখাদ ভ্রমণ সফর।

বর্ষার জঙ্গল যে কি অনুপম দ্রষ্টব্য তা চাক্ষুষ না করলে বোঝা দায়! গ্রীষ্মের দাবদাহ থেকে রেহাই পেয়ে বৃষ্টিস্নাত হয়ে গাছেদের আনন্দ আর ধরে না। নিজেকে যতটা সম্ভব সুন্দর, সুসজ্জিত, সুদর্শন করে তুলতে বিন্দুমাত্র কসুর করে না। নবযৌবন ফিরে পেয়ে নিজেকে উজাড় করে দেয় সে। জঙ্গলের যে দিকে তাকানো যায়, কেবলই নিবিড় সবুজের সমারোহ।

বেলপাহাড়ী থেকে কাঁকড়াঝোর যাওয়ার ২৫- ৩০ কিমি পথের সৌন্দর্য লেখনীতে উপস্থাপিত করার মতো এলেম আমার নেই। এমন অপার্থিব চোখজুড়ানো প্রাকৃতিক শোভা বর্ণনা করার মতো শব্দ ভান্ডার আমার তুণীরে কস্মিনকালেও ছিল না। তবে লিখতে না পারলেও মনের মণিকোঠায় সে শোভার সুখস্মৃতি নিশ্চিন্তে, সুরক্ষিতভাবে সঞ্চিত আছে। আর তা থাকবেও আজীবন।

অরণ্যের বুক চিরে যাওয়া ঝাঁ চকচকে পিচের রাস্তার উভয় দিকে শাল, সেগুন, মহুয়া, পিয়াশাল, আকাশমণি, ইউক্যালিপটাস, বহেড়া, কেন্দু ও আরও কতশত নাম না জানা গাছের সমারোহ। ক্ষেত্রবিশেষে কাজু গাছেরও দর্শন মেলে। গমন পথের বেশির ভাগটাই চড়াই- উৎরাইয়ে ভরা। গাড়ি একবার খাড়াই পথে তরতরিয়ে উপরে ওঠে তো পর মুহূর্তেই মসৃণ ঢালু রাস্তায় গড়গড়িয়ে নেমে চলে।

উত্তেজনার বশবর্তী হয়ে দু-একবার গাড়ি থামিয়ে জঙ্গলের অন্দরে নজর দিতেই মাথার উপরের আসমানী শামিয়ানা অজান্তে রংবদলে সবুজ হয়ে যায়। সবুজের পুরু পরত ভেদ করে সূর্যের আলো জঙ্গলের নীচটুকু পর্যন্ত নামার সুযোগ পায় না। একের পর এক রাশি রাশি সারি সারি বৃক্ষ দন্ডায়মান। এ যেন নিজেকে জাহির করার তীব্র প্রয়াস। একে অপরকে ছাপিয়ে যাওয়ার নিরন্তর প্রচেষ্টা। ফলস্বরূপ গাছের প্রস্থ যত না প্রসারিত হয়, তার থেকে কয়েকগুণ দীর্ঘায়িত হয় তার উচ্চতা।

ঘন অরণ্যের মাঝে নিজেকে হারিয়ে নিয়ে যেতে বিশেষ সময় লাগে না। কেবল জঙ্গলের মাঝে নিজেকে সম্পূর্ণ ভাবে সঁপে দিলেই হল! তারপরের কাজটুকু প্রকৃতিই সেরে ফেলে চুপিসারে। পরম আদরে সে তোমায় নিজের কাছে টেনে নেয়।

আঃ, এমন বিশুদ্ধ অক্সিজেন যে শেষ কবে ফুসফুস ধারণ করেছে তার ইয়ত্তা নেই। শহুরে ক্লান্তি নিমেষে উধাও। মেজাজ ফুরফুরে। দিল খুশ। সাথে পাখির কুজন তো আছেই। মন তো দু’কলি গেয়েই নিল গুনগুনিয়ে, ‘আহা কি আনন্দ আকাশে বাতাসে, শাখে শাখে শাখে পাখি ডাকে, কত শোভা চারিপাশে।’
জুতসই ক্যামেরা ও জাঁদরেল ক্যামেরাম্যানের যুগলবন্দী এই পাহাড়- জঙ্গলের দৃশ্যকে বিশ্বের যে কোন প্রাকৃতিক শোভাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলতে পারে।

নিরন্তর মজার মাঝেও আতঙ্ক যে নেই তা অবশ্য জোর দিয়ে বলা যায় না। যত্রতত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে পরে থাকা হাতির মল দেখে দিব্যি উপলব্ধ হয় যে এই জঙ্গল তাদের অবাধ বিচরণক্ষেত্র। এ পথে দলমার দামালদের নিত্য আনাগোনা। আর বিশেষ করে ঈষৎ সমতলে ফসল পাকার সময় তো কোনো কথাই নেই! হস্তি দর্শন যে নিশ্চিত তার জন্য হলফনামা দেওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। শুধু কি তাই! এই নিবিড় ঘন অরণ্য ভালুক, বুনো শুয়োর, হায়না, হরিণ সহ বিভিন্ন চতুষ্পদীর বাসভূমি। তাই জঙ্গলের অন্দরে খানিক উঁকিঝুঁকি মেরে আবার গাড়িতে বসলাম।

একের পর এক ভুলাভেদা, শিয়ারবিন্দ, চাকাডোবা, জমিরডিহা, ময়ূরঝর্ণা অতিক্রম করে অবশেষে বেলা ১২ টা নাগাদ পৌছালাম কাঙ্খিত গন্তব্যে অর্থাৎ কাঁকড়াঝোর।

হোটেল আগে থেকে বুকিং করা ছিল না। যদিও জানতাম মেরেকেটে ৩-৪ টের বেশি হোটেল বা হোম স্টে ছাড়া এখানে রাত্রিবাসের অবকাশ নেই। তবুও বরাতজোরে মাথা গোঁজার ঠাঁই পেয়ে গেলাম। মাহাতো হোম স্টে …

ভূত কি বিড়ি খায়?

ও হ্যাঁ, তার আগে কাঁকড়াঝোরের ইতিহাস খানিক না জানালেই নয়।
আচ্ছা, চিন্ময় রায়ের সেই বিখ্যাত চারমূর্তি সিনেমার স্মৃতি নিশ্চয়ই এখনও সতেজ। হাওয়া বদলের উদ্দেশ্যে পটলডাঙার টেনিদা, প্যালারাম, হাবুল ও ক্যাবলা যে ঝন্টি পাহাড়ে ঢু মেরেছিল সেটি আদতে বাস্তবের কাঁকড়াঝোর। বিখ্যাত এই বাংলা কমেডির বেশিরভাগ আউটডোর শুটিং হয় এই পাহাড়-জঙ্গলে।

আর সেই সাথে ঢ্যাঙা, কৃষ্ণকায়, পেটাই চেহারার ঝন্টুরামকে মনে আছে তো? হ্যাঁ, হ্যাঁ, যাকে প্রথম দর্শনেই ভূত ভেবে ভয় পেয়ে ভিরমি খেয়েছিল টেনি মুখুজ্জে। সেই ঝন্টু রামের চরিত্রে অভিনয়কারী গোপীনাথ মাহাতোর বাড়িতেই হল আমাদের নিশিযাপন।

গোপীনাথবাবু পরলোক গমন করার পর ওনার বসতবাড়িটি হোম স্টে হিসাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ওনার ভাইপো আছেন তদারকির দায়িত্বে। থাকা, খাওয়ার চমৎকার বন্দোবস্ত। সাবেকি আমলের মাটির দোতলা বাড়ির কাঠামো অটুট রেখে যতটুকু আধুনিক সুযোগ সুবিধার আয়োজন সম্ভব ততটুকুই এ বাড়ি তথা হোম স্টেতে মজুত। বাড়ির দেওয়াল এলাকার সমস্ত বাড়ির সঙ্গে সাযুজ্য রেখে রঙিন ভাবে সুচিত্রিত। ঘরের মধ্যেও দেওয়ালে রঙিন নকশা ও আলপনার কাজ। বাড়ির নীচের তলা ভাড়া দেওয়া হয় না। দোতলার চারটি কামরাই ভ্রমণ রসিকদের জন্য উন্মুক্ত। ঘরের মেঝেতে বিছানার আয়োজন। পুরু তোষকের ওপর বিছানার চাদর পাতা। ঘরের সঙ্গেই সংলগ্ন বাথরুম। সব মিলিয়ে অতি চমৎকার বন্দোবস্ত। আমাদের ঘরের জানালা দিয়ে সামনের পাহাড়ের দৃশ্য উন্মুক্ত। ঘর দেখেই থাকার বাসনা জাগে। সঙ্গে মানানসই খাবার। মনে করিয়ে দেওয়া ভালো যে, এই পরিবেশে কিন্তু ক্ষিদে বেশ দ্রুত তার উপস্থিতি জানান দেয়। পেট কেবলই খাই খাই করে। এমন চমৎকার পরিবেশে সুস্বাদু ভোজনের পর প্রাণ, মন চাঙ্গা হতে বাধ্য। তাইতো লিখতে বসেও স্মৃতিচারণের ঢেকুরে মন ভালো হয়ে যায়।

হোটেলে ঢুকে খানিক জলখাবার সেরে স্নানের পালা। হোটেলেই করা যেত দিব্যি। কিন্তু সফরসঙ্গীরা কেউই উন্মুক্ত প্রাকৃতিক পরিবেশে স্নানের অপূর্ব সুযোগ হাতছাড়া করতে চায় না। তাই ঝাড়গ্রাম তথা বাংলার সীমানা অতিক্রম করে ঝাড়খন্ডে চললাম জলকেলি করতে।

 

কাঁকড়াঝোর ড্যাম

নামেই ঝাড়খন্ড। পড়শি রাজ্য। গুগল ম্যাপের দর্শন ব্যতীত অনুধাবন করা কার্যত অসম্ভব। প্রকৃতি কি আর দেশ, সীমানার গন্ডি মানে? সে চলে তার আপন ছন্দে। মানুষের হস্তক্ষেপ দুই রাজ্যের সীমারেখা টানলেও প্রকৃতির কিস্যু যায় আসে না। তার গতি দুর্বার; তার ছন্দ অটুট; তার সৌন্দর্য আদি, অকৃত্রিম থাকে।

নিকটবর্তী কাঁকড়াঝোর ড্যামের নীচের জলে স্নানের এমন সুযোগ পেয়ে সকলেই যারপরনাই আপ্লুত। জলের বেগ ও বড় পাথরের চাই দেখে আমি প্রথম দিকে খানিক ঘাবড়ালেও সাথে সাতসঙ্গী থাকায় মনোবল খুব বেশি চিড় ধরেনি। বরং সকলের সাথে তালে তাল মিলিয়ে অবগাহনের এমন সুবর্ণ সুযোগ হাতছাড়া করলে আমার আপসোসের সীমা থাকতো না। বর্ষায় জলের তোড় বেশ তীব্র। পাহাড়ের লাল পাথরের গা বেয়ে নামার ফলে জলের রঙ ঈষৎ লালাভ। রঙ রাঙা হলেও জল কিন্তু স্বচ্ছ। স্নানের পক্ষে চলনসই। সেই জলে আট যুবকের দাপাদাপি বহুদিন স্মৃতিতে অমলিন থাকবে এবং সুখস্মৃতির তালিকায় বেশ উপর দিকেই তা থাকবে।

পিঁপড়ের চাটনি

স্নানপর্ব মিটতেই পেটে ছুঁচোর কেত্তন শুরু । ডনবৈঠক দিয়ে নিজেদের হাজিরা জানাতে দ্বিধাবোধ করে না। ক্রমশ দাপাদাপি বাড়ে। তাই হোটেলে ফিরে গোগ্রাসে খাওয়ার পালা। আহারে কোনরূপ আতিশয্য নেই। নিপাট সহজপাচ্য খাবার। স্বাদ চমৎকার। অন্যদিনের তুলনায় খানিক বেশি ভাত খেলাম বেশ তৃপ্তি করেই।

তবে খুব ইচ্ছা ছিল পিঁপড়ের চাটনি খাবার। শুনে রাঁধুনি জানালো, এখন বর্ষায় পিঁপড়ের ডিম পাড়ার পালা। সেই ডিমেরও চাটনি হয়। তবে তার স্বাদ আমাদের মত শহুরে জীবের জিভে রসনা তৃপ্তি দেবে না। তাই শীতকালীন দ্বিপ্রাহরিক আহারের মতো শেষ পাতে পিঁপড়ে বাটার সুস্বাদু চাটনির স্বাদ না পাওয়ায় মনের মধ্যে কিঞ্চিত আক্ষেপ থেকেই গেল।

কেটকি লেক

আহার পর্ব শেষে আবার ঘোরাঘুরির পালা। স্থানীয় দ্রষ্টব্য বা লোক্যাল সাইটসিইং দেখার উদ্দেশ্যে গাড়িতে চড়ে বেশ কিছুটা দূরত্বে গিয়ে যেখানে পৌছালাম তার নাম কেটকি লেক। প্রাকৃতিক এই হ্রদের চারপাশে যেসকল অনুচ্চ ছোটখাটো পাহাড় রয়েছে তারই জল ঝর্ণার আকারে নেমে জমা হয় হ্রদের অন্দরে। ওইভাবেই স্বাভাবিকভাবেই বর্ষাতেই লেকের জলের গভীরতা থাকে সর্বাধিক। বেশ অনেকখানি জায়গা জুড়ে তৈরি এই লেক। টলটলে জলের ওপর পাহাড়ের জল ছবির দৃশ্য এই হ্রদকে আরো নয়নাভিরাম ও মনোমুগ্ধকর করে তুলেছে। পাহাড়ি পরিবেশে জলের সংকটমোচনে এই হ্রদ বনের পশু-পাখিদের পিপাসা মেটানোয় দারুণ কার্যকর। বিশেষত গরমের সময়ে এই হ্রদের তাৎপর্য কয়েকগুণ বেড়ে যায়। লেকের পাড়ের চাষজমি ও লেকের পাড়ে বসে স্থানীয় মানুষদের ছিপ ফেলার দৃশ্য বুঝিয়ে দেয় কেবল বন্য জীবজন্তুই নয়, এই হ্রদ তাদের কাছেও আশীর্বাদ স্বরূপ। লেকের পাড়ে কিছুক্ষণ শরীর এলিয়ে আড্ডা দেওয়ার পর চললাম পরের দ্রষ্টব্য।


ঢাঙ্গীকুসুম গ্রাম-ডুঙরি জলপ্রপাত

এবারের গন্তব্য ঢাঙ্গীকুসুম গ্রাম। এখানকার সব স্থানের নামকরণেই বৈচিত্র বিদ্যমান। শুনতে বেশ লাগে। তিন খুদে গাইডের তৎপরতায় গ্রাম থেকে খানিক উত্তরায় হেঁটে পৌছালাম এক অনিন্দ্যসুন্দর পাহাড়ি ঝর্ণার কাছে। কি অনুপম তার রূপ! প্রাণবন্ত, প্রাণোচ্ছল। শীতকালে যে শীর্ণকায় বার্ধক্যের রূপ দেখা যায় তা বর্ষার জলে পরিপূর্ণ বিকশিত হয় নব যৌবনে রূপ ধারণ করেছে।

পাহাড় বেয়ে তীব্র বেগে নেমে আসা রক্তিম জলরাশি দেখে চোখ সার্থক। ঝরনার পোশাকি নাম ডুংরি আর সেই ঝরনার জল যে নদীকে পুষ্ট করেছে তার নামও ডুংরি। নামটায় বেশ পাহাড় পাহাড় ভাব বর্তমান, তাই না!

উত্তরের বড় বড় পাহাড়ি এলাকা বাদ দিলে পশ্চিমবঙ্গ ও তৎসংলগ্ন এলাকায় যেসকল জলপ্রপাত বর্তমান তার প্রকৃত রূপ পরিদর্শন করতে গেলে বর্ষাকালই শ্রেয়। কারণ এখানকার পাহাড় থেকে সৃষ্ট নদীগুলি বরফ জলে পুষ্ট। তাই শীত বা বছরের অন্য সময়ে ঝরনাগুলির যে রূপ পরিলক্ষিত হয় তার সাথে বর্ষার রূপের আকাশ-পাতাল প্রভেদ। ঝরনার চপলতা, প্রাণচঞ্চলতা দেখতে বর্ষাকালের বিকল্প নেই।

খুদে, অভিজ্ঞ গাইডদের সাথে আলাপচারিতা সাথে সাথে কখন যে আসা যাওয়ার পথ পার হয়ে যায় মালুম হয় না।

সিঙ্গাডোবার গ্রামীণ হাট

ডুংরি ফলস দর্শন সেরে গাইডদের পারিশ্রমিক মিটিয়ে ফিরতি পথে সিঙ্গাডোবায় এক অদ্ভুত দৃশ্যের সাক্ষী হলাম। সাপ্তাহিক গ্রামীণ হাট।

জঙ্গলমহলের অন্দরে আদিবাসী এলাকায় এমন হাট দেখার সাধ দীর্ঘদিন মনের মধ্যে জমা ছিল। এবারের সফরে তাও পূর্ণ হল।

বৈকালিক এই হাটে নিত্যপ্রয়োজনীয় সমস্ত জিনিসের জোগান মজুত। সবজি, মুদি, মাছ-মাংস, পোশাক, গৃহস্থালির জিনিসপত্র এমনকি অস্থায়ী কামারশালা পর্যন্ত বর্তমান। সতেজ সবজি অথচ দাম ন্যূনতম। লোকসমাগম যথেষ্ট।

হাটে হাঁড়িয়া ও অন্যান্য

তবে হাটের সর্বাধিক বেচাকেনা চলছে যেখানে সেটার কথা না উল্লেখ করলেই নয়। গ্রামীণ বাসিন্দারা সারিবদ্ধভাবে হাঁড়িয়া বিক্রি করছেন। আর হাটে আগত নারী-পুরুষ নির্দ্বিধায় তার স্বাদ আস্বাদনে মগ্ন। দেখে বাসনা জাগলেও দলের কেউই শেষমেষ হাঁড়িয়া পরখ করতে উদ্যত হয়নি।

তবে একেবারে খালি মুখে না ফিরে সদ্য ভাজা গরম গরম পকৌড়ি পরখ করে বুঝলাম তা কতটা সুস্বাদু! একেবারেই স্থানীয় একটি তেলেভাজার পদ। স্বাদ অসামান্য। ঠোঙা ভর্তি পকৌড়ি মুখে মুখে চালান হয়ে নিমেষে গায়েব।

ফেরত

এবার হোমস্টেতে প্রত্যাবর্তনের পালা। কেয়ারটেকারের সুস্পষ্ট আর্জি ছিল সন্ধের মধ্যে হোমস্টেতে ফেরত আসার। আমরা কথার খেলাপ করিনি। আসলে জঙ্গলমহলের এই দিকটায় অর্থাৎ ঝাড়খন্ড সীমানা লাগোয়া এলাকাগুলি এক দশক আগেও ছিল মাওবাদীদের খাসতালুক। তাই ওই সময় ভ্রমণ স্পট-এর তালিকা থেকে এই জায়গাগুলি ব্রাত্য হয়েছিল। কিন্তু সময় বদলেছে। বদলেছে পরিবেশ-পরিস্থিতি।

পাহাড়,জঙ্গলে আর মানুষের ভয় নেই। ভয় দাঁতাল দলের শ্বাপদের। রাতের আঁধারে তাদের সঙ্গে আমাদের অযাচিত মোলাকাত রুখতেই যে তার এই আর্জি তা বেশ পরিষ্কার।

মশা ও বসা

আরেকটি উপদ্রব, যার কথা না লিখলেই নয় তা হল মশা। হোমস্টের নিচের খাটিয়ায় বসে গল্পগুজব করার সময় ক্রমাগত বাধা সৃষ্টি করে চলেছে এই পতঙ্গ। এক মুহুর্ত ফুরসতের জো নেই। নিরন্তর, নিরলসভাবে শরীরে বিভিন্ন জায়গায় হুল ফুটিয়ে চলেছে। অতঃকিম নিচে আড্ডা দেওয়া মুলতুবি রেখে হোমস্টের ঘরে মুড়ি তেলেভাজা সহযোগে আড্ডা জমালাম। এখানেও তেনারা হাজির। কিন্তু মশা দমনকারী তেলের ব্যবহারে কিছুক্ষণ পরেই মশার আগমনে ভাটা পড়ে । আমরাও নিস্তার পাই।

প্রথম রাত্রে

রাত্রি দশটার মধ্যে নৈশকালীন আহার শেষ। ঘরের জানালা খুলতেই সামনের ভৈরবী পাহাড়ের স্পষ্ট ছায়ারূপ নজরে আসে। শুক্লপক্ষ থাকায় পাহাড়ের আর এক মনোহরিণী রূপ মনকে আরো বেশি করে প্রকৃতিপ্রেমী করে তোলে। স্বচ্ছ চাদরে মোড়া পাহাড়ের অপার্থিব রূপ কখনো ভোলার নয়। পূর্ণিমার টলটলে জ্যোৎস্নায় এই পাহাড়-জঙ্গলের মায়াবী রূপের মানসচিত্র কল্পনায় ধরা দিতেই মন খুশিতে নেচে ওঠে। এই স্থানে দ্বিতীয়বার সফরে এলে নির্ঘাত তা কোন এক পূর্ণিমাতেই হবে।

ভাগ্য সুপ্রসন্ন হলে নিকটবর্তী বাড়িগুলি থেকে ধামসা মাদলের ধ্বনি শোনা যায়। আর সেই মাদলের তালে আদিবাসীদের নাচের সাথে পায়ে পা মিলিয়ে দু’কদম নাচের স্মৃতি যে কোন মতেই বিস্মৃতির অতলে তলাবে না তা হলফ করে বলা যায়।


আমলাশোলে একদিন

পরের দিন, কাকভোরে উঠে প্রতাপদাকে সঙ্গী করে হাঁটা দিলাম আমলাশোল এর উদ্দেশ্যে। দূরত্ব আহামরি কিছু নয়। কাকড়াঝোর-এর পাশের গ্রাম। হাঁটাপথে মিনিট কুড়ি সময় লাগে। আমার কাকড়াঝোর ভ্রমণের আর এক উদ্দেশ্য ছিল আমলাশোল দর্শন। সেই আমলাশোল যা খবরের শিরোনামে আসে 2004 সাল নাগাদ। অনাহারে মৃত্যু হয়েছিল বেশ কয়েকজন আদিবাসীর। আর অপুষ্টি, দুর্ভিক্ষের কবলে জর্জরিত ছিল সমগ্র তল্লাট। সেই আমলাশোলের বর্তমান রূপ জানার তীব্র বাসনা ছিল।
গ্রামের বুক চিরে কংক্রিটের ঢালাই রাস্তার উপর দিয়ে পায়চারি করে যেতে যেতে চোখে আসে কাঁচা-পাকা বাড়ি। গ্রামের মাঝে জলের ট্যাঙ্ক। জায়গায় জায়গায় ট্যাপ কল। গ্রামের সমস্ত বাড়িতে বিদ্যুতের উপস্থিতি। এছাড়াও রাস্তার মোড়ে মোড়ে সৌরবাতিস্তম্ভ। গ্রামজুড়ে শবর ও মুড়া সম্প্রদায়ের মানুষজনের বাস। প্রায় প্রতি বাড়িতেই হাঁস, মুরগি, গরু,ছাগল প্রভৃতি গবাদিপশুর উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো। চাষবাস, গবাদিপশুর প্রতিপালন, বন থেকে কাঠ,শালপাতা ও কেন্দু পাতা সংগ্রহ ছাড়াও এলাকার মানুষজন শীতকালে বাবুই ঘাস থেকে দড়ি বানিয়ে জীবিকা নির্বাহ করে।

এই দৃশ্য দেখে মন ভাল হয়ে গেল। বুঝলাম আমলাশোল তার তিক্ত অতীতের খোলস ছেড়ে নতুনভাবে উন্মোচিত হয়েছে। মনে মনে উপরওয়ালার কাছে আমলাশোলের সামগ্রিক বিকাশের প্রার্থনা প্রতাপদার অলক্ষ্যে সেরেই ফেললাম।

না যাওয়া আমঝর্ণা গ্রাম

আমলাশোল-এর পরের গ্রাম আমঝর্ণা। নাম শুনেই যেতে সাধ হয়। ছবির মতো সুন্দর সে গ্রাম ও তার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। কিন্তু দেরি হয়ে যাওয়ায় আমরা সে পথে না গিয়ে ফেরার পথ নিলাম। ফিরতি পথে দলের বাকি সফরসঙ্গীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ। আমাদের খোঁজ না পেয়ে এই পথে হাঁটা দিয়েছিল।

জিও কাকা!

একটা কথা এই প্রসঙ্গে না বললেই নয়, তা হল এই চত্বরে কিন্তু জিও ছাড়া অন্য যে কোন নেটওয়ার্ক অকেজো। আমার ফোনে ভিন্ন নেটওয়ার্ক থাকায় দুদিন ফোনে বাক্যালাপ হয়নি। ফোনে কেবল ছবি তোলার কাজই হয়েছে অবিরত।

ঝাড়খন্ড-সীমানায় ভৈরব মন্দির

এরপর দলের সকল সঙ্গীরা মিলে একসাথে হাঁটা দিলাম ঝাড়খন্ড সীমানার উদ্দেশ্যে। হোটেল থেকে মিনিট পাঁচেক হাঁটার পর ছোট্ট এক খালের ওপর কংক্রিটের ঢালাই ব্রিজ অতিক্রম করতে ঝাড়খন্ডে হাজির। পথে নজরে আসে এক রংচঙে নজরমিনার। সেটায় আরোহণের চেষ্টা না করে আমরা পৌঁছালাম বাংলা-ঝাড়খন্ডের সীমানা লাগোয়া ভৈরব মন্দির। বড় বড় গাছে বেষ্টিত ঘন জঙ্গলের মাঝে এক সুউচ্চ বাবা মহাদেবের মন্দির। ভিতরে ছোটখাটো পাথরপ্রতিমা। তবে মন্দিরের চারপাশ বেশ পরিষ্কার, পরিচ্ছন্ন। দেখে মনে হল নিত্যপুজোর ব্যবস্থা আছে। এই ভৈরব বাবার নামানুসারেই এলাকাবাসী এই পাহাড়টিকে ভৈরব পাহাড় হিসাবে আখ্যায়িত করেছে। আমাদের হোমস্টের জানালা দিয়ে এই ভৈরব পাহাড়ের মনোরম দৃশ্য স্পষ্ট নজরে আসে।

এবার ফিরাও মোরে

হোটেলে ফিরে গরম গরম লুচি ও তরকারি সহযোগে প্রাতরাশ সেরে বিদায় জানালাম কাঁকড়াঝোরকে। মন কিছুতেই বিদায় নিতে চাইছিল না। আরো প্রাণভরে উপভোগ করতে চাইছিল অফুরান প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং সবুজের সমারোহ।

তবু কালের নিয়মে বিদায় জানাতেই হল কাঁকড়াঝোরকে। যদিও ততক্ষণে সে মনের অন্দরে বাস করার চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত করে ফেলেছে।

———————-

সুমন হাইত

স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার সময় সেভাবে লেখার অভ্যাস বা অবকাশ কোনোটাই হয়ে ওঠে নি। এরপর চাকরি খোঁজার মরিয়া প্রচেষ্টায় পরের কয়েক বছর পার। স্কুল শিক্ষক হিসেবে কর্মরত হওয়ার পরে অল্পস্বল্প লেখার অভ্যাস তৈরি হয়। তাও অবরেসবরে। প্রতিদিন নিয়ম করে পেন, খাতা নিয়ে বসার অভ্যাস আজও ঠিকমতো গড়ে তুলতে পারলাম না। না, এর জন্য সময়কে কাঠগোড়ায় না তুলে অভিযুক্ত করবো নিজে চপল মানসিকতাকে। তার অর্থ ওই….. ভালো লাগলে লিখি, আর না লাগলে লিখি না। ব্যাস, এটুকুই। আর এটুকুতেই যদি কিছু পাঠকের মনে ছাপ ফেলতে পারি, তবে সে আমার পরম প্রাপ্তি। পাঠকের স্বস্তি ও আশীষই তো এক উঠতি লেখকের সম্বল। তাকেই পাথেয় করে এগোতে চাই, আমি, সুমন হাইত।

]]>
https://glocalcharcha.in/2021/12/01/ruposhi-kankrajhore/feed/ 0