অরিন্দম লাহিড়ীর কলমে
হিন্দি আধিপত্যবাদ মানি না। চিনি আধিপত্যবাদ মানি না। খাড়িবোলি আধিপত্য বাদ যাক। বাংলা আধিপত্যবাদও মানি না। আমরা জানি, রামচন্দ্র নারায়ণজী দ্বিবেদী কী ভাবে বলিউডের খুড়োর কলে কবি প্রদীপ হয়ে গেছিলেন, কী ভাবে তাঁর লেখা একের পর এক গানকে ব্যবহার করে ক্যাশবাক্স ভরিয়েছিলেন তখনকার হিন্দি সিনেমার প্রযোজকেরা। আদরের বলিউড নাম তখনও বোধ হয় দেওয়া হয়নি। কিন্তু এই ঘোর সত্য যদি আজ আমাদের ভুলিয়ে দেয়, কী ভাবে একটা সদ্য স্বাধীন দেশ জুড়ে মানুষের আবেগকে ছুঁয়ে যেতে পেরেছিল তাঁর গানের চরণ, তা হলে ন্যায়বিচার হবে কি? আমরা যেমন ভুলব না, কবি প্রদীপের লেখা ‘আরতি উতারু তেরি সন্তোষী মা’ শুনে সিনেমা হলেই পুজো শুরু করে দিতেন মহিলারা, তেমনই ভুলব না তাঁর সেই অমোঘ উচ্চারণ “ইনসান কা ইনসান সে হো ভাইচারা, য়েহি প্যায়গাম হামারা”। ভুলব না কী ভাবে ভারত ছাড়ো আন্দোলনের মুহূর্তে, ‘কিসমত’ ছবির ‘আজ হিমালয় কি চটি সে ফির হামনে লালকারা হ্যায়’ গানের মাধ্যমে ব্রিটিশ সেন্সরশিপকে সাময়িক বিভ্রান্ত করতে পেরেছিলেন তিনি।
কিন্তু আজকের আসল গল্পটার শুরু ইংরেজরা ভারত ছাড়ার পনেরো বছর পরে। ১৯৬২’র সেই চীন-ভারত যুদ্ধের সময়ে সীমান্তে অনেক শহীদের মধ্যে একজন ছিলেন পরম বীর শৈতান সিং ভাটি। তাঁর আত্মবলিদান গভীর ভাবে স্পর্শ করেছিল রামচন্দ্র নারায়ণজী দ্বিবেদীকে। তাই হিন্দি ছবি ‘ইন্ডাস্ট্রির’ অপেক্ষা না করে লিখে ফেলেন ‘অ্যা্য মেরে য়াতন কে লোগো’, সুরকার রামচন্দ্র নারহার চিতলকর-এর (সি রামচন্দ্র নামে খ্যাত) দোনামোনা স্বত্ত্বেও লতা মঙ্গেশকরকে দিয়ে এই গান গাওয়ানোর জন্য রিহার্সাল শুরু করান। এই গানের মধ্যে ধরা আছে স্বাধীনতা-উত্তর ভারতীয় জনমানস আর ভারতের সামরিক বাহিনীর আন্তঃসম্পর্কের নির্যাস।
আজ ২০২০ সালে যখন ভারতের ২৯টি ইউনিকর্ন (১ বিলিয়ন ডলার-এর বেশি মূল্যের স্টার্ট আপগুলোকে আদর করে এ নামই দেওয়া হয়েছে)-এর অন্ততঃ ১৬টিতে কমপক্ষে একজন চীনা বিনিয়োগকারী সংস্থা রয়েছে; তার মধ্যে আবার ৮টিতে চীনা সংস্থাই হল ‘লিড ইনভেস্টর’; ভারত-চীন দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য লেনদেন ৯৫.৫৪ বিলিয়ন ডলার ছুঁয়েছে; যে বেসরকারি সংস্থার বিজ্ঞাপনে প্রধানমন্ত্রীর পাতা-জোড়া মুখ দেখে ঘুম ভেঙেছিল একদিন সকালে (ভেঙেছিল কি?), সেই আলিবাবা’র আশ্চর্য প্রদীপ-ধন্য পে টি এম থেকে শুরু করে আমাদের সবার সাধের (এবং স্বাদের) জোম্যাটো, সুইগি বা ভূতের রাজার এক বর-সদৃশ ওলা, কিংবা আলালের ঘরের দুলালদের জন্য তৈরি ‘বাইজু’- সবই চীনে চীনে দারুণ চেনা হয়ে উঠেছে, তখন আর ১৯৬২’র সেই আবেগ উস্কে তোলার সার্থকতা আছে কি? বিশেষ করে, আমাদের জন-গণ-মন অধিনায়কেরা যখন ভারতীয় রেল কিংবা ধুঁকতে থাকা ভারত সঞ্চার নিগম লিমিটেড-এর উন্নয়নকল্পে আমন্ত্রিত চীনা সংস্থাদের তাড়াবার উদ্যোগ নিয়েই নিয়েছেন? আহা, দু’চারটে চোখে জল আনা বক্তৃতাও কি বাদ যাবে? দেশের জি ডি পি-র প্রায় ষাট ভাগ যখন বেসরকারি চাহিদা-জোগান দ্বারা নিয়ন্ত্রিত, তখন চোখে জল আনার আহ্বান জানানো এই গানের স্মরণ যেন ‘রণং দেহি’ মনোভাবের ইন্ধন না হয়ে ওঠে। তা হলে তা এই গানের অপমান। কিন্তু এই গানটাকে স্মরণ করছি, আর এই গানের মধ্যে দিয়ে স্মরণ করছি সেই কুড়িজন শহীদকে, কারণ এখনও আমার দেশটা শুধু সরকার চালায় না। সরকারে দরকার নেই যাদের, তাদের নিজস্ব সুড়ঙ্গেও ‘এক যে আছে আজব দেশ’। ভুল করে আমাকে আবার লাল করিডরের লোক ভেবে বসবেন না যেন, প্লিজ, প্লিজ। এমনিতেই তিন মাস ধরে ‘হাউজ অ্যারেস্ট’-এ আছি।
কিন্তু এতটা পর্যন্ত পড়ে যাদের হাত গীয়ম আপোলিনের কিংবা উইলফ্রেড আওয়েন প্রমুখদের কপচানোর জন্য নিশপিশ করছে, তাদেরকে বলি, আরেকবার ভাল করে পড়ুন ওই কবিতাগুলো। না বুঝলে আরও একবার। ধুলোপড়া তাক থেকে সে সব বই নামাতে যতক্ষণ সময় লাগে, ততক্ষণে নীচে পড়ে নিন এই কুড়ি জনের নাম-ধাম। বাজারে খবরের তো অভাব নেই। যতক্ষণ চীন আছে সেই বাজারে, ততক্ষণ অন্তত চিনে রাখুন এঁদের।
শহীদ স্মরণে
সিপাই আমন কুমার – সমস্তিপুর, বিহার
নায়েব সুবেদার মনদীপ সিং – পাতিয়ালা, পঞ্জাব
হাবিলদার কে পালানি – মাদুরাই, তামিলনাড়ু
সিপাই চন্দন কুমার – ভোজপুর, বিহার
নায়েক দীপক সিং – রেওয়া, মধ্যপ্রদেশ
সিপাই গুরতেজ সিং – মানসা, পঞ্জাব
সিপাই কুন্দন কুমার – সাহার্সা, বিহার
সিপাই জয় কিশোর সিং – বৈশালি, বিহার
সিপাই গুরবিন্দর সিং – সাংরুর, পঞ্জাব
নায়েব সুবেদার নুদুরাম সোরেন – ময়ূরভঞ্জ, ওড়িশা
সিপাই গণেশ হাঁসদা – পূর্ব সিংভূম, ঝাড়খন্ড
নায়েব সুবেদার সৎনাম সিং – গুরদাসপুর, পঞ্জাব
ল্যান্স হাবিলদার বিপুল রায় – আলিপুরদুয়ার, পশ্চিমবঙ্গ
সিপাই অঙ্কুশ – হামিরপুর, হিমাচল প্রদেশ
সিপাই কুন্দন কুমার ওঝা – সাহিবগঞ্জ, ঝাড়খন্ড
সিপাই রাজেশ ওঁরাও – বীরভূম, পশ্চিমবঙ্গ
সিপাই গণেশ রাম – কাঙ্কের, ছত্তিশগড়
সিপাই চন্দ্রকান্ত প্রধান – কান্ধামাল, ওড়িশা
হাবিলদার সুনীল কুমার – পাটনা, বিহার
কর্ণেল বিকুমাল্লা সন্তোষ বাবু – হায়দ্রাবাদ, তেলেঙ্গানা

অরিন্দম লাহিড়ী
Arindam Lahiri is a postgraduate in Comparative Literature from Jadavpur University, and a copywriter by profession. He started his advertising career seven years ago at Ogilvy. Since then, Arindam has worked in major campaigns for brands like Anandabazar Patrika, Star Jalsha, Fevicol, Eno, Pantaloons, Asian Paints, Vodafone, Amazon and Tata Sky. He writes on politics and the culture industry.









