সুপর্ণা ঘোষের কলম ও ক্যামেরায়
আর্ট ডিরেকশন : প্রণয় সাহা
বেশ কিছুটা সময় কাটিয়েছিলাম ওদের সাথে, এই বছর ( ২০২১) দুর্গাপূজোর সপ্তমীর দিন। ওরা মানে আসানসোলের “স্ব-শক্তি স্বধারগৃহ” হোমের (পরিচালনায় জয়প্রকাশ ইনস্টিটিউট অফ সোস্যাল চেঞ্জ, সহায়তায় নারী ও শিশু বিকাশ ও সমাজ কল্যান দপ্তর, পশ্চিমবঙ্গ সরকার) মিষ্টি সব কন্যাদের সাথে। সত্যি ওদের দেখে প্রথমেই মনে হয়েছিল বেশ সার্থকনামা তো! প্রতিটি কন্যা ছোট্ট থেকে বড় সব্বাই স্ব-শক্তিকে ভরপুর। হোম কন্যাদের যিনি দেখাশুনা করেন মানে সুপারিন্টেন্ডেট নাম সেরিনা, আলাপ হল তার সাথেও, সপ্রতিভ, মিষ্টভাষী, করিৎকর্মা। কন্যারা তাকে শ্রদ্ধাও করে ভালবাসেও। পরিবার না পাওয়া কিছু কন্যারা একসাথে থাকে এখানে ঠিক একটি পরিবারের মত। আমরা যেতে তাই আমাদের আদর আপ্যায়নের কোন রকম ত্রুটি পাইনি। সদা হাস্যময়ী কন্যারা খুব গুণবতীও বটে। নাচ, গান, আবৃত্তিপাঠ, হাতের কাজ আরও কত কিছু। ওদের সুমিষ্ট ব্যবহার ও হাসিখুশি থাকা দেখে আমরা বুঝেছি যারাই এই হোমের সম্পূর্ন দেখাশুনায় আছেন বিভিন্ন দিকে, তারা সত্যিই আপ্রাণ চেষ্টা করছেন ওদের ভালো রাখার। সবার নাম উল্লেখ করলাম না আর আলাদা করে, তবে কথা হল ফোনে হোমের কাউন্সিলার সাহারা মন্ডলের সাথে। সাহারার থেকে জানলাম অসম্ভব এক মন ছুঁয়ে যাওয়া বিষয়। এই হোমের আটজন কন্যার বিয়ে দিয়েছেন এঁরা খুব সুন্দর ভাবে,পাশে পেয়েছেন বহু সুজনকে, যারা এই সুন্দর উদ্যোগের সাথে জুড়ে গেছেন। সেই কন্যারা আজ সুনামের সাথে সংসার করছে! সত্যি তো বড় আনন্দের। আসলে ওদের জীবন যেখানে প্রায় অন্ধকারে ছিল, এই হোমটিতে এসে যেখানে ওরা আলোর সন্ধান পেয়েছে সেখানে ওরা যে অন্য সংসারে গিয়ে আলো বিচ্ছুরণ করবেই তা তো স্বাভাবিক।
কন্যাদের যার যেটা গুণ তুলে ধরার প্রচেষ্টা চলছে এখানে, তা দেখে আমার বেশ ভালো লেগেছে যেহেতু বেশিরভাগ কন্যার পড়াশুনার বয়স উত্তীর্ণ তাই এই প্রচেষ্টা। লক্ষ্য হল সব্বাই যাতে আবার সমাজের মূল স্রোতে ফিরে যেতে পারে। ফিরে আসি আবার কন্যাদের কথায়। ওদের হাতের কাজ দেখে যেমন আমরা অবাক, মুগ্ধ, তেমনই আনন্দে মন ভরে গেছে ওদের হাতের ভারি সুন্দর রান্না খেয়ে। আমরা যাওয়ায় কন্যারাও ভীষন খুশি – নাচে গানে মাতোয়ারা, এতেই ওদের আনন্দ, এতেই ওদের খুশি উপছে পড়ছে যেন! দেখতে দেখতে ভাবছিলাম এত প্রাণশক্তি ওরা পায় কোথা থেকে যেখানে আমরা খুব অল্পেই কাতর হয়ে যাই! হাজারটা “না-পাওয়া” তে ভরা ওদের জীবন তবুও এই হোমে এসে একটা সুন্দর পরিবার পেয়েছে – তবুও তো কোথাও ওদের মনের গভীরের সুন্দর ইচ্ছাগুলো আর পাখনা মেলে উড়তে পারেনি, থমকে গেছে শুরু হওয়ার আগেই, তবুও এত জীবনীশক্তি! অনেক অনেক অনুপ্রাণিত হলাম আমরা ওদের দেখে, তবে শিখতে পারলাম কতটুকু কেজানে!
কিছু কথা থাকে যা প্রাণ খুলে কাউকে বলা যায় বড় আপন ভেবে, তা শুধুই শুনতে হয়, অনুভব করার চেষ্টা করতে হয়-তাই ওদের কথাগুলো শুনলাম, চেষ্টা করলাম অনুভব করতে যতটা পারলাম, কিন্ত তা আর লিখলাম না। এগিয়ে চলুক ওরা অফুরন্ত জীবনীশক্তিকে সঙ্গী করে, আমরা বরং অনুপ্রাণিত হই বরং নিজেদের সঙ্কুচিত মনকে প্রসারিত করি আর সমাজের মূল স্রোতে কন্যারা যাতে সঠিকভাবে পদার্পন করতে পারে সেই দিকটায় লক্ষ্য রাখি, কারন আমরা সচেতন না হলে ওদের এই অদম্য লড়াইকে কুর্নিশ জানাতে পারবো না। আবার ওদের কাছে ফিরে যাবই কোন আর একদিন, এই অঙ্গীকার করে, এক সমুদ্র ভাল লাগা নিয়ে বিদায় জানালাম স্ব-শক্তিময়ী সেই কন্যাদের।

সুপর্ণা ঘোষ
আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন লেখক-ফোটোগ্রাফার সুপর্ণা ঘোষ দীর্ঘদিন ধরে বহু নামজাদা ম্যাগাজিনে লিখেছেন। কবিতার জন্য পরপর দু’বার পেয়েছেন ইন্টারন্যাশনাল লাইব্রেরি অফ পোয়েট্রি (আমেরিকা)-র আউটস্ট্যান্ডিং এ্যাচিভমেন্ট পুরস্কার। ইন্টারন্যাশনাল লাইব্রেরি অফ ফোটোগ্রাফি থেকে পেয়েছেন গোল্ড ব্রোচ। NASA-র পেজ-এ তাঁর তোলা ছবি দেখা যায়। স্বীকৃতি পেয়েছেন ইংল্যান্ড-এর রাজপরিবার থেকে, রাণী এলিজাবেথ পাঠিয়েছেন শুভেচ্ছাবার্তা। ফোটোগ্রাফির জন্য সম্মানিত হয়েছেন রাশিয়াতেও। দুর্গাপুরের মেয়ে সুপর্ণার স্কুল-কলেজ-বেড়ে ওঠা ওই শহরেই। বেশ কিছুদিন কাটিয়েছেন কানাডায়। এখন কলকাতার বাসিন্দা।









