শ্রেয়া সেনগুপ্তর কলমে
শক লাগা লাগা লাগা শক লাগা- আরে না রে বাবা কোনও প্রচলিত বিজ্ঞাপনের প্রমোশন করছি না। এই যে স্বর্গীয় খাদ্য বস্তুটি তার স্বাদ মফঃস্বলের ছেলেবেলার একটা পরম পাওনা। টক-নোনতা মেশানো স্বাদের থেকে ঝটকা খাওয়ার আকর্ষণটা ছিল বেশি পছন্দের। দেখতে মোটেও ভালো নয়, অনেকটা ফিকে কয়লা গুঁড়োর মতো। কিন্তু খেয়ে জিভ কালো করার মজা যারা খায়নি তাদের অধরা। না কোনরকম স্বাদের ফিরিস্তি দেওয়া লেখার উদ্দেশ্য নয়।
নুনের মোড়কে একটা সীমানা নির্দেশের গল্প বলবো বলে ভাবলাম।
এক সময় স্কুল ড্রেসের পকেটে প্রায় ছোট হাতের মুঠোয় যতটা ওঠে মুচড়ে ভরে নাকেমুখে হোম ওয়ার্ক গুঁজে কখন খেলতে যাবো আর বন্ধুরা মিলে প্যাকেট কে প্যাকেট সাবাড় করবো সেই চিন্তায় ভ্যান কাকুকে তাড়া দিয়ে দিয়ে মাথা খারাপ করতাম। কিন্তু বাড়িতে এসে একরকম প্রায় ড্রাগ পাচারকারীদের মতো মায়ের চোখ এড়াতে হতো কারণ জিনিসটা অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর ছিল বলে মা স্কুল থেকে এলেই মা কালী হতে বলতো।
তারপরই চোখ মুখ বাঁচিয়ে রেখে মারতো। এই স্কীম বুঝতে আমার প্রায় বেশ কিছুদিন সময় লেগেছিল এবং কেটে বেরোনোর রাস্তাও বের করে ফেলেছিলাম বন্ধুদের সঙ্গে আলাপ আলোচনা করে।
এখানেই থেমে যায়নি বিষয়টা। এই স্বাদের ভাগ করে নেওয়াটা কখন আমার মজ্জাগত হয়ে উঠেছিল নিজের অজান্তেই। সে’বার কাকুর বাড়ি গেছিলাম গরমের ছুটিতে; স্টক করে নিয়ে গেছিলাম সেই মতো দিন সাতেকের। মা জানতো না, জানলে মেরে ছাল তুলে ওতেই খানিকটা নুন ডলে দিতো বোধ হয়। কাকুর বাড়ি আদ্যোপান্ত শহুরে। কাকুর মেয়েরা শহরের নামীদামী কনভেন্টে পড়াশুনো করে। কাকু এবং কাকিমা দু’জনেই বহুজাগতিক সংস্থায় উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। তার মধ্যে কারেন্ট লবণ- ভাবা যায়? যাই হোক কাকুর মেয়ে মিষ্টিকে দুপুরের কাঠফাটা রোদে ছাদে তুলে চাখিয়েই দিলাম এই দুর্লভ অভিজ্ঞতা। সে তো পুরো ফিদা! আরেকটু দে, আরেকটু দে করে এতো বেশি পরিমাণে খেতে শুরু করলো তার
শহুরে পেট হাল ছেড়েদিল।
যথারীতি ‘কী খেয়েছিলের’ ময়নাতদন্তে উঠে এলো একমুঠো নুন।
কাঠগড়ায় ম্যায় অউর মেরি নমক আর চারদিকে ১০১টা বিভিন্ন মাপের প্রাপ্তবয়স্ক আঙ্গুল। কেন? কেন -র রবে আমি তখন গুরুতর অপরাধী খালি চোখের নীচে খুরের কাটা দাগটাই নেই এই যা। যাই হোক মায়ের মার তো একটাও মাটিতে পড়লো না গায়ের দাগ তো মিটে গেলো মিনিট দশেকের মধ্যে। কিন্তু যেটা আজীবন মনে দাগ কেটে রয়ে গেলো সেটা ছিল কাকিমার একটা কথা বোনকে বলেছিল আমার সামনে, “দিদিভাইরা বনবাদাড়ে থাকে এই ধরণের আজেবাজে জিনিস খেয়ে অভ্যস্থ, তাবলে কি তোমার পেটে এ’সব সহ্য হবে?”
কী আশ্চর্য! মফঃস্বলের লোকজন আজেবাজে জিনিস খায় আমিও জেনে অবাক হয়েছিলাম খানিক, কারণ যাবতীয় আনাজ তো গ্রামের দিক থেকেই যায়। তাহলে কি সেগুলো পাতে দেওয়ার অযোগ্য? নাকি এইভাবেই গ্রাম শহরের প্রভেদ করা হয় আর গায়ে ডাউনমার্কেটের তকমা সাঁটিয়ে দেওয়া হয়? আজও ভুলিনি কারেন্ট লবণের মোক্ষম শক!









