রোহিত দত্ত রায়ের কলমে
মুকুল তৃণমূল ছাড়ল কবে? সেপ্টেম্বর ২০১৭-এ, দল ছেড়ে দেওয়া তৃণমূল কংগ্রেসের সেই সময়কার রাজ্যসভা সাংসদ, ও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দীর্ঘদিনের একনিষ্ঠ সহকারী, মুকুল রায়, লোকসমাজে এতদিন বিজেপি র সাথে ঘর করে আজ ১১ জুন ২০২১-এ ফের তৃণমূলে ফিরছেন, তখন এই প্রশ্নই উঠে আসছে গেরুয়া শিবিরের অলিন্দে। “সে তো বিজেপিতে পাঠানো দিদির চর” বলছে বিজেপি-র বহু নিচু তলার কর্মী। ওপর তলার নেতাদের বারেবারে সতর্ক করেও লাভ হয়নি। ভার্জিলের এনিয়েডে গ্রিক স্টেটদের ট্রয়ের দরজায় ছেড়ে যাওয়া ট্রোজান হর্সের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে মুকুলকাহিনী, হতাশ বিজেপি কর্মীদের একাংশকে। এটাও ভুলে গেলে চলবে না যে, গত মাসের সি বি আই গ্রেফতারিগুলো মুকুলকে ভয় দেখানোরই কারণে করা। ততদিনে দল জেনে গেছে মুকুল আর লুকোছাপা করতে চাইছে না। প্রকাশ্যে তৃণমূলেই ফিরতে চাইছে। তৃণমূলকে জব্দ করাটা কেবল মুকুলকে ভয় দেখানোর রণনীতির একটি বাইপ্রোডাক্ট ছিল। বিজেপি বুঝিয়ে দিতে চেয়েছিল যে ‘আমাদের ছেড়ে গেলে নিস্তার নেই’। কিন্তু মমতার নিজাম প্যালেস ঘেরাও নিশ্চয়ই আবারও মুকুলকে আশ্বস্ত করেছিল। এর আগে বঙ্গে ইলেকশনের সময়েও প্রার্থী চয়নে প্রাক্তন তৃণমূলীদের ঠাঁই দেওয়া, পুরাতন বিজেপিকে প্রাধান্য না দিয়ে নতুন মুখ দাঁড় করানো থেকে আরম্ভ করে টলি ও টেলি পাড়ার তারকাদের ঠাঁই দেওয়া, যা বিজেপির বিপুল ক্ষতি করেছে একাংশের মতে, সবই নাকি হয়েছিল মুকুলের প্ল্যান মাফিক।
এই মুকুল রায়ের তৃণমূলে ঘর ওয়াপসির সাথে সাথে একটা জিনিস স্পষ্ট হয়ে গেল- মধ্যপন্থী উদারবাদী শক্তিরা ঘোড়া কেনা বেচা করে ক্ষমতা ধরে রাখতে পারলেও, ডান বা বাম শক্তিগুলির পক্ষে তা অসম্ভব! তাদের সংগঠন গড়ে ওঠে এক ধরণের মতাদর্শের ভিত্তিতে , তাৎক্ষণিক জয়লাভের ভিত্তিতে নয়। মুকুল যে বরাবরই বিজেপিতে মমতার চর, এই গুঞ্জন বাংলার আরএসএস মহলে বহুদিন। কিন্তু কৈলাশ বিজয়বর্গিয়র নির্দেশে এবং অমিত শাহের ‘ওয়ন এট এনি কস্ট’ ফর্মুলা সেই সাবধানবাণীর তোয়াক্কা করেনি। মুকুলের বিজেপি নেতাদের সাথে প্রকাশ্যে আশা রেকর্ডিং নিয়েও দলের অনেকে বলেছিলেন যে, ফোনে আড়ি পাতা হলে তার রেকর্ডিং অনেক অস্পষ্ট হয়, কারণ সেটি রেডিয়াস-নির্ভর ! সব কটা রেকর্ডিং আখেরে বিজেপির ছবি খারাপ করেছে। সি বি আই , ই ডি, ইলেকশন কমিশনকে কন্ট্রোল করে বিজেপি , তৃণমূলের করা আগের অভিযোগ প্রমাণিত করেছিল সেই রেকর্ডিং। তখন বিজেপির অনেক নিচু তলার অনেক কর্মী নেতৃত্বের দিকে এই প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছিল যে, এগুলি মুকুলের নিজের ফোনে করা রেকর্ডিং মনে হচ্ছে না? তোয়াক্কা করেনি দল। এই অভিযোগ প্রলয় পালের বিরুদ্ধেও বেশ কিছু মহলে উঠেছে, যাকে অনেকেই তৃণমূল এর চর মনে করছে। তবুও তাতে দলের ভ্রুক্ষেপ নেই। অথচ এই প্রলয় পালের সাথে কথোপকথনের রেকর্ডিং-এর জোরেই কিন্তু বিজেপিকে তৃণমূল এটি বোঝাতে সক্ষম হয়েছিল যে নন্দীগ্রামে মমতা হারছে, তাই ঝাঁপিয়ে পড় নন্দীগ্রামে , এবং বিজেপি দলের অন্দরে গুঞ্জন যে, রাজ্যের অন্যত্র এই কারণেই দিশাহীন হয়ে পড়ে দল। এটাকেও মমতার কৌশল বলে সতর্কতা জারি করেছিল আরএসএস-এর এক অংশ। তাও শোনার তখন লোক ছিল না ৬ নম্বর মুরলিধর সেন লেন-এ। অতএব মুকুল গেল, সঙ্গে বিজেপির দল ভাঙিয়ে তৈরি দলের একূল-ওকূল দুই গেল।
আসলে ঘোড়া কেনা বেচার রাজনীতিতে মমতা যুগপৎ অভিজ্ঞ ও দক্ষ। অমিত শাহ এবং নরেন্দ্র মোদী, বা তাদের (হ্যাঁ, তাদেরই, কারণ আরএসএস কিন্তু টালিপাড়ার হিরো-হিরোইনদের নেওয়ার ব্যাপারে বরাবরই বিরোধী থেকেছে) ধ্যান-ধারণায় দীক্ষিত রাজ্যগুলিতে ভারপ্রাপ্ত এযুগের নেতারা এটা বার বার ভুলে যায়। আপাতত এটা ধরে নেওয়াই যায় যে, আগামী দিনে ঘর ওয়াপসি আরও হবে। বিজেপি-র সামনে এখন নিশ্চিহ্ন হওয়ার থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াই। বিজেপি-র কফিনে শেষ পেরেক পুঁতে দেবে হয়তো আরএসএস-ই, যদি তারা মমতার বন্ধুত্বের হাত আবার ধরে রাজ্যে বিজেপিকে ভোটে মদত দেওয়া বন্ধ করে, নিজেদের শিক্ষা-সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলিকে নির্ঝঞ্ঝাটে চালিয়ে সুদূর ভবিষ্যতে হিন্দু রাষ্ট্র স্থাপনের দিকে মনোযোগ করে। এই অবস্থানটা আরএসএস-এর চোখ দিয়ে দেখলে আপোষও হবে না, কারণ মমতা আগের ‘সর্ব ধর্ম সম্ভব’ অর্থাৎ নেহেরুভিয়ান বহুত্ববাদের থেকে গান্ধী-র ‘আমি সনাতনী হিন্দু’ এবং অন্য ধর্মের প্রতিও সহিষ্ণু রাজনৈতিক অবস্থানের কাছে এসে গেছেন। আরএসএস-এর হিন্দু রাষ্ট্রে বিজেপি-র সরকার থাকা বা মুসলমানেদের না থাকাটা শর্ত নয়, শর্ত একটাই – সবাইকে মেনে নিতে হবে তারা আদতে জাতিগতভাবে ‘হিন্দু’ , সে যে ধর্মেরই লোক হোক না কেন। বাংলায় যেহেতু ধর্মের অনেক আধুনিক আবিষ্কারকে সাংস্কৃতিক মোড়কে মুড়ে ফেলে তাকে স্থায়িত্ব দেওয়ার প্রচেষ্টা ঊনবিংশ শতাব্দী থেকে চলে আসছে, তাই এই প্রয়াস সফল হলেও হতে পারে।
বামেরা শোনা যাচ্ছে ভোটে নেই, সরকারে নেই, দরকারে আছে। বাংলা অনেকটা গুজরাটের মতোই বিরোধী-শূন্য হয়ে গেল। বাম বা কংগ্রেস কি বিরোধী হয়ে ঘুরে দাঁড়াতে পারবে? কারণ মমতার বিরুদ্ধে যাওয়া ভোট মমতার বিরুদ্ধেই যাবে যতদিন না তিনি ক্ষমতাচ্যুত হচ্ছেন। সেক্ষেত্রে বিজেপির অবক্ষয় কি আবার বামেদের বা বাম কংগ্রেস কে উজ্জীবিত করতে পারে? নাকি মোদীর শাসনকালেও এই বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন এবং দেশের চতুর্থ সবচেয়ে জনবহুল রাজ্যে নিজের একাধিপত্য স্থাপন করে মমতা ইউ পি এ চেয়ারপার্সন হওয়ার দিকে আরও কয়েক পা বাড়িয়ে রাখলেন ? এই প্রশ্নগুলির উত্তর সময়ই দেবে। তবে যে প্রশ্নের উত্তর সবার জানা, এবং আকাশে ভাসছে, তা হল – মুকুল তৃণমূল ছাড়ল কবে?
***
Rohit Dutta Roy is a Doctoral scholar at the Faculty of History, University of Cambridge. He began his doctoral research at Cambridge after completing an MPhil in Modern History from the Centre for Historical Studies, Jawaharlal Nehru University. Rohit has First Class BA and MA degrees in Comparative Literature from Jadavpur University, and a First Class Master’s in History from the University of Delhi. His stories on politics and policy have appeared in The Wire, Newslaundry and The Citizen. Rohit writes on the everyday political, policy history, identity formation and governmentality.

Rohit Dutta Roy
Rohit Dutta Roy is a Doctoral scholar at the Faculty of History, University of Cambridge. He began his doctoral research at Cambridge after completing an MPhil in Modern History from the Centre for Historical Studies, Jawaharlal Nehru University. Rohit has First Class BA and MA degrees in Comparative Literature from Jadavpur University, and a First Class Master’s in History from the University of Delhi. His stories on politics and policy have appeared in The Wire, Newslaundry and The Citizen. Rohit writes on the everyday political, policy history, identity formation and governmentality.









