Notice: Function _load_textdomain_just_in_time was called incorrectly. Translation loading for the htmega-pro domain was triggered too early. This is usually an indicator for some code in the plugin or theme running too early. Translations should be loaded at the init action or later. Please see Debugging in WordPress for more information. (This message was added in version 6.7.0.) in /home4/rohitifo/glocalcharcha.in/wp-includes/functions.php on line 6170

Warning: session_start(): Session cannot be started after headers have already been sent in /home4/rohitifo/glocalcharcha.in/wp-content/plugins/htmega-pro/includes/helper-function.php on line 39
সামিয়ানা – GloCal Charcha
Warning: Undefined array key "options" in /home4/rohitifo/glocalcharcha.in/wp-content/plugins/elementor-pro/modules/theme-builder/widgets/site-logo.php on line 93

সামিয়ানা

পর্ব – 1; জেনকিন্স

দেশপ্ৰিয় রায়ের কলমে

আর্ট ডিরেকশন – প্রণয় সাহা

শিরোনাম-অঙ্কন – প্রসেনজিৎ বেরা

এই লেখার ভাবনাটা শুরু আজ থেকে বছর বিশেক কি তার অল্প আগের একটা দিন থেকে। প্রথম দিকে মনে হয়েছিল, এত দিনের অবাধ্য জীবনের ইতিটা বোধ হয় এসেই গেলো। আগের দিনগুলোতে যে স্কুলটাতে পড়তাম, সেখানে ভাবনাগুলোকে মেলে দেওয়ার ‘স্পেস’ ছিল অনেকখানি। সে-সব ছেড়েছুড়ে সম্পূর্ণ এক অন্য জগতে পা রাখার শুরু। সবার মুখে শুনে এসেছি, যেখানে যাচ্ছি, সেখানে নাকি ভয়ঙ্কর সব নিয়ম, পড়াশোনায় দারুণ ভালো না হলে সেখানে টেকা যায় না। ভয়ে তো ছিলামই, উত্তেজনাও কিছু কম ছিল না। প্রথম ক্লাসটা যিনি নিলেন, তাঁর জাদুকাঠির ছোঁয়ায় ক্লাসের সবাই নতুনভাবে জেগে উঠেছিলাম। একঘেয়ে পড়তে থাকা, সকাল – বিকেলের বাঁধাধরা রুটিন – এইসবের মধ্যে ওঁর চল্লিশ মিনিটের ক্লাস মাইকেল শুমাখারের গতি এনে দিত সবার মধ্যে। সেদিন বাইরের লোকেদের কাঁচ থেকে শোনা একঘেয়ে কথাগুলোকে এক পাশে সরিয়ে দিয়ে নতুন ভাবে চিনতে শুরু করলাম জেনকিন্স স্কুলকে। জেনকিন্স পরিবারের আর সবার মতো করে, যে-পরিবারের সদস্যরা আজ ছড়িয়ে আছেন বিজ্ঞান থেকে পরিবহণ, চিকিৎসা থেকে শিক্ষকতা, রাজনীতি থেকে অভিনয় – সমাজের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই।

এর পরের জার্নিটা আর-সবার মতোই, এক স্টেশন থেকে আরেক স্টেশন… শেষে গন্তব্যে পৌঁছানো, তারপর সেই ট্রেনটাকে বিদায় জানানো। আমাদের ট্রেনটা আর-সবার মতোই, তেমন আহামরিও কিছু নয়, গোটাটাই স্লিপার ক্ল্যাস, আর বগিগুলোও অনেক দিনের পুরনো। তবে ট্রেনের ভেতরে এত কিছুর ছড়াছড়ি যে আমরা গোটা গোটা জার্নিটা নিংড়ে নিয়েছিলা যতটা সম্ভব। যে যার নিজের মতো করে।

বেসরকারি স্কুলগুলোতে সব কিছুই বড় বড়, সব ক্ষেত্রেই ‘লার্জার দ্যান লাইফ’ ব্যাপারস্যাপার। আমাদেরটা তেমন নয়, বাড়বাড়ন্ত কিছুতেই নেই। এক কোথায়, স্নিগ্ধ একটা স্কুল। আর এই স্নিগ্ধতাটুকু যার ছোঁয়ায় আমরা বুঝতে পারি, শুধু আমরা নয়, আমাদের সিনিয়ার – জুনিয়ার সবাই, তার সমন্ধে না বললে স্কুলের অনেকখানি কথা ভেতরেই থেকে যায়। সিনিয়রদের কাছ থেকে এত দিন তাঁর কথা শুনে এসেছি। ক্লাস সিক্সে উঠে ক্লাস-রুটিনের সঙ্গে আস্ত একটা শক উফার পেলাম আমরা – বাংলা ক্লাস নেবেন BCR, মানে ভুপালবাবু। তাকে যদিও আগে চিনতাম, কিন্তু সামনাসামনি কথা, পরিচয় হয়নি আগে। ওঁর প্রথম ক্লাস। তাই টেনশন আর উত্তেজনা ছিল সবার মধ্যেই। সেই প্রথম আলাপচারিতা আমাদের সঙ্গে। ভূপালবাবু নিপাট ভদ্রলোক, স্নিগ্ধ ব্যক্তিত্ব আর সুদর্শন। সত্যি বলতে কি, ওঁর ক্লাস এক কথায় কমপ্লিট এডুকেশন – এনসাইক্লোপিডিয়া প্যাকেজ। সেখানে পড়ার সব জিনিস থেকে শুরু করে জীবনের ছোট ছোট মুহূর্তগুলো ফুটে উঠত চোখের সামনে। আমাদের সবার বসে বসে মরচে পরে যাওয়া ভাবনাগুলো ওঁর কথার একটু ছোঁয়ায় ছুটতে থাকতো। ওঁর পিরিয়ডে গোটা ক্লাস সাইলেন্ট। না, কোনও ভয় থেকে নয়, ওঁর প্রতি সম্ভ্রম থেকেই ক্লাসের সেরা বিচ্ছু ছেলেটাও শান্ত হয়ে যেত। তখন আবহে কেবল পাশের ক্লাসগুলোর অল্প-অল্প চেঁচামেচি, রাস্তা দিয়ে চলে যাওয়া গাড়ির হর্ন… তবে সেগুলোও আস্তে-আস্তে দূরে হারিয়ে যেত। ওঁর সঙ্গে কখনও আমরা পদ্মাবতীর বিয়েতে, কখনও রবীন্দ্রনাথ হয়ে অনুভব করতাম নিজেকে মৃত্যুঞ্জয় বলে, কখন-বা সঙ্গী হতাম গ্রামের ঘরে সার-বাঁধা পিপড়েদের!

বছরভর সাদা শার্ট, সবুজ প্যান্ট, টাই, পিঠে স্কুল ব্যাগেই আমাদের জীবনগুলো ছিল সীমাবদ্ধ। নাথিং এক্সাইট্মেণ্ট। এর মাঝে কোনও কোনও ছু-মন্তর মুহূর্ত আমাদের নাড়িয়ে দিয়ে যেত। যেমন স্পোর্টস, সরস্বতী পুজো, শঙ্কর-স্মৃতি। এই সময় নানা অ্যাক্টিভিটিতে সবাই মশগুল হয়ে থাকতাম আমরা। স্পোর্টসে ক্লাস ফোর থেকে নাইন সবার জন্য কম্পালসারি ছিল ড্রিল। কেউ গোঁ ধরে বসে থাকত না করার জন্য, কেউ থাকত রেগেমেগে। কিন্তু করতে তো হবে সবাইকেই! প্রতিদিন চার পিরিয়ডের পর থেকে বিকেল অবধি চলত প্রাকটিস। টানা এক মাস, একঘেয়ে। কোনও অজুহাত না শোনা, কিছুটা বিরক্তি – সব উসুল হয়ে যেত স্পোর্টসের দিন পারফর্মেন্সের ননস্টপ পাঁচ মিনিটের হাততালিতে।

লেখাটা যখন লিখছি, ফেসবুকে-হোয়াটসঅ্যাপে আমার সঙ্গে সেই দশ বছরের সহযাত্রী শুভ্রজ্যোতি, স্বর্ণদ্বীপ, রাজপ্রিতম, অচিন্ত্য, অভিক। নস্ট্যালজিক হয়ে পড়ছি খুব।

সরস্বতী পুজোর সময় নাটক, গান, সায়েন্স, এগজিবিশন, আর্ট গ্যালারি – সব ছাড়িয়ে যে জিনিসটা আমাদের নাড়া দিত তা ছিল দুপুরে খাওয়ার সময় কল্যাণবাবুর পায়েস! পলিটিক্যাল সায়েন্সের শিক্ষক কল্যাণবাবু ফি-বছর এই দিনটাতে নিজের টাকায় ছাত্রদের পায়েস খাওয়ান – সেই থেকে আমাদের কাছে পায়েসটা ‘কল্যাণবাবুর পায়েস’!

বেশ কিছু বছর আগে স্কুলের তৎকালিন মাস্টারমশাই শঙ্করপ্রসাদ চক্রবর্তী সি আর পি এফের কাজের প্রতিবাদ করায় তাদের গুলিতে মারা যান। তাঁর স্মৃতিতে প্রত্যেক বছর ওই দিনটি স্মরণ করা হয়। আর তাঁর আগের ১৫ দিন ধরে চলে বিভিন্ন ক্লাসের মধ্যে ফুটবল টুর্নামেন্ট। যে দল যেতে, টিচার্স ডে তে স্যারেদের টিমের সঙ্গে হয় তাদের খেলা। আমাদের ব্যাচটা কোনও বারই জিততে পারেনি, তবু আমাদের সাথে স্যারেদের টিমের ম্যাচ হয়েছিল অনেক বার, নিয়ম ভেঙ্গেই। আর খেলার কথা বলতে গিয়ে এই মুহূর্তে মনে পড়ছে আর একজনকে – ইন্দ্রনীল। সত্যি, ওর মতো ‘কুল’ প্লেয়ার গোটা স্কুলে একটিও ছিল না। ‘নো প্রেশার, নো কেয়ারিং’ একটা ব্যাপার ছিল ওর মধ্যে। যে কারণে সবচেয়ে ভালো প্লেয়ারকে ছাপিয়েও সবার চোখ চলে যেত ইন্দ্রনীলের দিকে।

মোটামুটি মাধ্যমিকের সময় থেকেই যে ব্যাপারটা চলে আসে, তা হল কাউকে ভালো লাগা, তাঁর জন্য ছুটে যাওয়া, আর সেই সুত্রে কিঞ্চিৎ ক্লাস ফাঁকির ব্যাপারস্যাপার। তবে সবাই তা করতো না, কেউকেউ একদম অর্জুনের মতো ক্যারিয়ার গড়ায় মন দিত। কিন্তু যারা করত, তারা এই ব্যাপারটাতেও বলতে গেলে জেলার সবার আগে! আমাদের স্কুলের ছাত্রেদের নিয়ে একটা কথা চালু আছে – পড়াতেও আগে, কারটেসিতেও আগে, নতুন কিছু করাতেও আগে আর দুষ্টুমিতেও সবার আগে ‘জেনকিন্স’। এই জেনকিন্স শুধু লেখাপড়ার জন্য নয়, জেনকিন্স হল জীবনকে জানার স্কুল, জীবনে হার না মানতে শেখার স্কুল, তৈলমর্দন না করে যোগ্যতায় – পারদর্শিতায় – সততায় সব কিছুতে উত্তীর্ণ হওয়ার পাঠ সেখার স্কুল, পেছন থেকে আঘাত করে ‘খ্যাতির প্রভু’ – ‘হিমরাজ পুত্র’ না হওয়ার শিক্ষা প্রাপ্তির স্কুল। হাজার হলেও রবি ঘোষ, রজনীকান্ত সেন, অমিয়ভূষণ মজুমদার, বিশ্বজিৎ চট্টোপাধ্যায়, শহীদ কৃষ্ণকুমার দাশদের স্কুল বলে কথা।

এখন বন্ধুদের মধ্যে কেউ প্যারিসে, কেউ টরেন্টো, কেউ বা দেশের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে আছে জীবিকার প্রয়োজনে। করোনার আক্রমনের ঠিক আগের বছর পুজার সময়টাতে বন্ধুদের সাথে দেখা। অনেক বছর পরে সবার স্কেডিউল মিলে গেছিলো ২০১৯ – এ। নতুন শহরের অভিজ্ঞতা, কাজের ক্লান্তি, কারও মনের মতো চাকরি না পাওয়া, রিলেশনশিপ, আসন্ন বিয়ে – এই নিয়ে আড্ডা জমেছিল। কারও ব্রেক আপ হয়ে গেছে, কেউ বা কারও জন্য অপেক্ষা করছে সেই কবে থেকে, এক বন্ধুর পিতৃবিয়োগ – হতাস, নিঃসঙ্গ মুহূর্তগুলোও ভেসে উঠছিল কথায় কথায়। পুজোর ছুটির শেষে চলে আসার আগের দিন খুব শিগগিরিই আবার দেখা করার প্রমিস করা, স্কুল জীবনের ক্রাসদের নিয়ে একপ্রস্থ আলোচনা – এই সবের মাঝে অভীকের একটা কথা মন্তাকে নাড়িয়ে দিয়ে গেল হঠাৎঃ ‘আমার মতো তোদেরও বুকের মাঝখানটা কি ফাঁকা – ফাঁকা লাগে স্কুলটার জন্য?’