সে ছিল এক আজব সময়! তখন হাওয়ায় ছিল মন্ত্রগুপ্তি। গাছে গাছে বাঁধা ছিল গ্রামবন্ধন। মানুষ জানত, কোন দিকে কোন সময়ে গেলে বিপদ। কখন কার ছায়া দেখে আর ফিরে তাকাতে নেই। জীবনের যাবৎ সঞ্চয় বিগ ডেটার অতলান্তে ডুবিয়ে দিতে দিতে মানুষ তখনও ভুলে যায়নি পিতৃপুরুষের স্মৃতিকে রক্তের মধ্যে অন্তঃসলিলা রাখার প্রকরণ, ভুলে যায়নি পূর্বনারীর কল্পনাকে জাগরূক করে রাখার পদ্ধতি আর উপকরণগুলো। প্রাচীন ও অর্বাচীনের মধ্যে এমন অসেতুসম্ভব সম্বন্ধ তৈরি হয়নি তখনও। তখনও দেবতারা অকূল পাথারে অসহায়, তখনও তাঁরা চৈতন্যরূপিনী নারীশক্তির শরণার্থীবৃন্দমাত্র, আর তখনও সেই ব্রহ্মময়ী নারীশক্তি প্রায়-প্রেতেদের প্রণয়প্রার্থিনী! আর তখনও তিনিই তাদের হন্তারক!
সেই সময়ের তুলনায়, বাংলার তো ভূত সুশীল-সুবোধ। চেনা মানুষ। গোয়ালপাড়ার গাছে গাছে, ঝুলে থাকে সে, অচেনা পথিকের সঙ্গে রঙ্গময় কথোপকথনে মেতে ওঠে, বিভ্রম-ভ্রান্তি-মায়ায় ভুলিয়ে দেয় চেনা বাস্তবের রুক্ষতা। অতীতের আয়নায় নিজেদের মুখ দেখতে বাধ্য করে। বাংলা সাহিত্যের সেই জবরদস্ত ভূতেরা এখনও আমাদের ছেড়ে-গিয়েও-ছেড়ে-যেতে-না-চাওয়া অতীত। যার কালো, কুচকুচে, ভয়াল অন্ধকারের কুলুঙ্গিতে এখনও বাঙালির আরামের কোলবালিশ রাখা। বাঙালির রকমসকম তাই যতই পালটে যাক না কেন, যতই সে ডি জে বক্সের উদ্দামতায় মেতে ভুলে গিয়ে থাকুক না আসল ভূতের নৃত্য, আন্তর্জালে জড়িয়ে গিয়ে যতই সে হয়ে উঠুক আন্তর্জাতিক হ্যালোউইন-প্রকল্পের অংশ, দাদু-দিদিমার, কাকা-পিসীমার মুখে মুখে ফেরা সেই বাংলার ভূতেরা আজ ভূত চতুর্দশীর রাতে রীতিমতো হাওয়ায় হাওয়ায় ছড়িয়ে পড়ছে বাংলা জুড়ে।
ফেসবুক মিমে। ইন্সটাগ্রাম স্টোরিতে। টিভিতে। রেডিওতে। মানুষের মনে। বছর দুয়েক আগে, এরকমই এক রেডিও-অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বাংলার ভূতেদের বার্তা দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়েছিল। লেখক অভিনন্দন বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিশাল ভূত-প্রকল্প ‘প্রেতপার্বণ’-এর অতিসংক্ষিপ্ত রপের সেই সশব্দ ভূত-কাহিনির বাণিজ্যিক প্রচারের ঢক্কানিনাদ, সম্প্রচার চলছে, চলবে। প্রতি বছরের মতোই। কিন্ত গ্লোক্যাল চর্চার পক্ষ থেকে আমরা উৎসাহী ছিলাম লেখকের সামগ্রিক ভূত-দর্শন নিয়ে! ‘প্রেতপার্বণ’-এর সেই দীর্ঘ, মূল পাঠ GloCal Charcha tellTale-এর পাঠকদের সামনে প্রথমবার উপস্থাপিত করতে চেয়েছিলাম। প্রায় সাড়ে ছ-হাজার শব্দে লিখিত এই দীর্ঘ কাহিনি আসলে বাংলার ভূতেদের চালচিত্র। তাদের ভূত-ভবিষ্যৎ-বর্তমানের সুলুকসন্ধান। এমন গল্প আপনি সত্যিই জীবনে শোনেননি! না শোনেননি কোত্থাও।
সম্পূর্ণ মূল পাঠ
ভূত-প্রেতের অস্তিত্বের দুটো প্রছন্ন দিক রয়েছে, এক নম্বর হল ভয়, আর দু’নম্বর- বিশ্বাস। এক নম্বরে অর্থাৎ ভূতপ্রেতের ভয়ে আমি চিরকালই কাবু- উল্টে এই ভয় পাওয়া ব্যাপারটা কতকটা মানসিক নেশার মতো মনে হয়, ঘোর ঘোর লাগে। তবে ভূত-প্রেত-দত্যি-দানো-এসব অতিলৌকিক তথা Paranormal বিষয়বস্তুতে- আমার কোনও কালেই বিশ্বাস ছিলনা, সেটা আমার কট্টর নাস্তিকতার কারণেই হয়তো…কিন্তু আজ, দু-হাজার আঠেরো’র- একত্রিশে অক্টোবরের এই হ্যালোইন সন্ধ্যায়- দক্ষিণ-পশ্চিম লন্ডনের টুইকেনহ্যাম অঞ্চলের- আমাদের এই বাড়িতে ঘটে যাওয়া একটা ঘটনার পর থেকে… সেই বিশ্বাসেরও জন্ম হল।
আজ থেকে প্রায় দু’হাজার বছর আগে- আজকের দিনেই, গ্রীষ্ম ও শীতের সন্ধিক্ষণে, কেল্টিকভাষী জনগণেরা ফসল কাটার উৎসব- ‘সামহেন’ পালন করতো মহা সমারহে। বলা হত এই দিন- রাতে, মৃত্যুর দেবতা ও আঁধারের রাজপুত্র সাহেইন- সব মৃত আত্মাদের ডাক দিতেন জীবিতদের পৃথিবীতে অবতরণ করার জন্য। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে এই ‘সামহেন’ – যে কিভাবে খ্রিস্ট ধর্মের কলে পড়ে “অল হ্যালোজ’ ইভ” হল , আর কি করেই বা পার্বণের বিবর্তনের রীতি মেনে আজকের “হ্যালোইন”-এ তা রূপান্তরিত হল… সেসব কথা আজ ইতিহাস। এখন ‘হ্যালোইন’ বলতেই ট্রিক-ওর-ট্রিট, বনফায়ার কিংবা হাল ফ্যাশনের হালোইন কস্টিউম পার্টি- যার সম্প্রতিতম শিকার কিনা আমি নিজে স্বয়ং।
শিকার বলার কারণ অবশ্যি আমি নিজেই- চরম নাস্তিকতার পাশাপাশি ভিড় ভাট্টা, লোকজন- কোনো কালেই পছন্দ করিনা। ফলে পার্বণ পালন কিম্বা উৎসব উৎযাপনের থেকে দুরেই থেকেছি বরাবর। ছেলেবেলায় মা-বাবা যেমন বুঝে গিয়েছিলেন , বিগত তেইশ বছরের সহধর্মিণীটিও তেমনি মেনে নিয়েছে-আমার এই কট্টর নাস্তিকতা এবং উৎসব বিমুখী ব্যবহার। কিন্তু – আমার সতেরো বছরের ছেলে সহজ এবং পনেরো বছরের মেয়ে শ্রুতির কাছে এসে-আমাকে হার মানতেই হল।
বেশ কয়েক বছর ধরেই তাদের আক্ষেপ এবং আবদার এই- যে তাদের সব বন্ধুবান্ধবের বাড়িতে হ্যালোইন উপলক্ষে পার্টি পালন করা হয় কিন্তু তাদের বাড়িতে কোনও বছরই কিছু হয়না… অবশেষে, নতশিরে-আমায় হার মানতে হল এবছর।
ফলত আজ সকাল থেকেই সারাদিন চলল পার্টির যাবতীয় প্রস্তুতি, তারপর সন্ধ্যে হলে যথাসময়ে গেস্টদের আসা শুরু হতেই- গুটিগুটি পায়ে কেটে পড়ে আমি গা ঢাকা দিলাম আমার দোতলার স্টাডিতে। অ্যাটিকের জানলা দিয়ে দেখলাম লাল রঙ মাখা মুখোশ পরা জম্বি (Zombie)- সেজে দুজন এসে ঢুকল বাড়িতে- তারপর গবলীন, কঙ্কাল, উইচ, ড্রাকুলা কেউই বাকি থাকলো না একে একে। উত্তাল গান-বাজনা ও চিৎকারের মিশেল মার্কা কিছু একটা শুরু হয়ে গেল নিচে। এবার কিছুক্ষণেই আমার স্ত্রী এসে ভদ্রতার খাতির-টাতির- দেখিয়ে নিচে একবার নিয়ে যাবেই – এও জানি। অগত্যা যতক্ষণ নিভৃতে থাকা যায়- সেই চেষ্টাই করছিলাম।
বাড়ির পিছনের বাগান থেকে বারবিকিউ-এর গন্ধ ভেসে আসছিল- আমি হাতের স্কচের গ্লাসটা নিয়ে অ্যাটিকের সামনে এসে দাঁড়ালাম। দক্ষিণ-পশ্চিম লন্ডনের টুইকেনহ্যাম শহরের উত্তর পূর্ব-দিকে- থেমস নদী লাগোয়া কেমব্রিজ গার্ডেনের উল্টো দিকেই আমাদের এই বাড়িটা। আজ বছর আস্টেক হল আমরা এই বাড়িতে আছি। দোতলা সেকেলে আমলের বাড়ি। উপর তলার এই স্টাডি কাম অ্যাটিকে উঠলেই,কাচের জানলা দিয়ে ঢিল ছোঁড়া দূরত্বে থেমস – বাঁ দিকে তাকালেই বড়ো বড়ো ঝাউ আর ইউক্যালিপ্টাসের ফাঁক থেকে রিচমন্ড ব্রিজ চলে গিয়েছে নদীর ওপারের রিচমন্ড শহরে। এখন অবশ্য অন্ধকারের চাদরে সবই ঢাকা পড়েছে… ইতিমধ্যে স্ত্রী ও মেয়ে এসে কয়েকটা চোখ-দাঁত-মুখ কাটা উজ্জ্বল ফাঁপা কুমড়োর লন্ঠন সাজিয়ে রেখে গেল নিচের সদর দরজার সামনে- আমার ধড়াস করে মনে পড়ে গেল ছেলেবেলায় মা’র ভূত চতুর্দশির সন্ধ্যে-তে চোদ্দ প্রদীপ দেওয়ার দৃশ্য… পৃথিবীর সব প্রান্তের নানান ধর্মের নানান রীতিনীতি- চোখের সামনে কিভাবে জড়িয়ে পেঁচিয়ে মিশে এক হয়ে গেল যেন… অ্যাটিকের জানলার কাচের ফাঁক থেকে নদীর দিককার ঠাণ্ডা হাওয়া আসছিল। কাচটা বন্ধ করে এসে স্টাডির টেবিলে- প্রখ্যাত বিজ্ঞানী মিশিও কাকু’র ‘আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স’ এর বইটা খুলে বসতেই যথারীতি গিন্নী এসে হাজির-
- কি গো! চলো নিচে একবার!
পিছন পিছন দেখি- উইচ তথা পশ্চিমি ডাইনী’র সাজে কন্যাও হাজির-
- Don’t be a spoiltsport baba! Come for once no!… সবাই কত costume পরে এসেছে! My friends are asking- where is uncle…
তারপর সে তার ডাইনী মার্কা নাক এনে আমার মুখের সামনে ধরে বলল –
- আচ্ছা- Am I looking scary or demented!?!… look at my nose!…
আমি মনে মনে বেশ বুঝতে পারলাম যে আর রক্ষে নেই, এই বেলা নিচে না গেলে আমার কন্যা একে একে তার সব বন্ধু-বান্ধবীর অদ্ভুতুড়ে সাজ দেখাতে নিয়ে আসবে আমার এই সাধন কক্ষে… অগত্যা নিচে গিয়ে বুড়ি ছুঁয়ে আসাই শ্রেয়। চলে এলাম নিচে।
নিচে এসে তো আমার চোখ ছানা বড়া। ভূত-প্রেত-রাক্ষস-জম্বিতে ভর্তি নিচের তলার লিভিং রুম। ছেলে সহজকে দেখলাম ড্র্যাকুলার পোশাকে ঘুরে বেড়াচ্ছে কোল্ডড্রিঙ্কস হাতে। পেছনের বাগানে লাল-সবুজ-নিল রঙের তীক্ষ্ণ আলোয় চলছে নাচানাচি- এক কোনায় চলেছে বারবিকিউ। আমি নেমে আসতে হাই-হ্যালো সারার জন্য ব্যাপারটা কিছুটা শান্ত হলেও কিছুক্ষণেই যে কে সেই। মেয়ে ডেকে আলাপ করিয়ে দিল তার কিছু স্কুলের বন্ধুবান্ধবেদের সঙ্গে। পাড়ার কিছু বিলিতি পড়শিরাও হাজির উদ্ভট সব সাজে- এরা পারেও বটে!
আমি ইতিমধ্যে গুটিগুটি পায়ে যখন প্রমাদ গুনব ভাবছি- ঠিক তখনই হঠাত, বাড়ীর পিছনের দিকে বাগানে নামার আগে বারন্দাটায় চোখ যেতেই থমকে গেলাম। এক বৃদ্ধ ধূতি-পাঞ্জাবী পরে বসে আছেন চুপচাপ- বাগানের দিকে মুখ করে। তাঁর মুখ দেখা যাচ্ছেনা ভেতর থেকে। বারন্দায় পাতা টি-টেবিল সহ দুটো বড়ো বড়ো কাঠের চেয়ারের একটিতে তিনি বসে। আমি সত্যিই ভূত দেখার মতনই অবাক হলাম বটে! লন্ডনের এই অঞ্চলে ধূতি পাঞ্জাবী পরে পার্টিতে কে আসে!?…
ভদ্রলোকের চেহারা গোলগাল, মুখটা কতকটা লাউয়ের মতন- পরনে আদ্দির পাঞ্জাবীতে ভুঁড়ির প্রকাশ স্পষ্ট। মাথায় একটা চকচকে নিটোল টাক। গাল কামানো। বড়ির মতন মোটা নাক’টার তলা থেকে ঝুলছে এক গুচ্ছ পাকা গোঁফ। কানটা মুখের তুলনাতে একটু বড়ো-ই যেন। রঙটা ফ্যাকাশে ফরসা। টাক ছাড়া যেটুকু চুল তা ধবধবে সাদা। আমি আলাপ করতেই বেশ বড়ো বড়ো ঝকঝকে এক সারি দাঁত বার করে এক গাল অমায়িক হেঁসে হাতজোড় করে পরিষ্কার বাংলায় পরিচয় দিলেন-
- নমস্কার! ব্রহ্মকমল বন্দ্যোপাধ্যায়! আপনি শ্রুতির বাবা নিশ্চয়? প্রতীক বাবু?
বাবা!! স্বভাবতই আমি একটু অবাক হলাম- ভদ্রলোক আমাকে চেনেন দেখছি! এই এলাকায় জনা কয়েক বাঙ্গালী পরিবার আছে বটে কিন্তু এনাকে আগে দেখেছি বলে… মনে পড়েনা। আমার চোখে-মুখে এবং গলার স্বরে বিস্ময়টা প্রকাশ পেয়ে যায় বোধ হয়। আমি একটু গলা ঝেড়ে উত্তর দিই-
- আজ্ঞে- কিন্তু আপনাকে তো ঠিক-
- আমি আসলে- আপনার কন্যা শ্রুতির বান্ধবী এশানা’র দাদু। আসলে ওর মা-বাবা দিন দুয়েকের জন্য নিউ কাসেল যাওয়ায়-ওকে একা আসতে হত এই পার্টিতে- একা একা রাতে ছাড়া যায়না… তাই আমিও চলে এলাম।
আমার হাবভাবে বোধ হয় এখনও ধন্ধ-টা যায়নি কিম্বা উনি হয়তো মনের প্রশ্নটা পড়ে ফেলেই হো হো করে হেঁসে উত্তর জুড়ে দিলেন-
- আপনি বুঝি আমার ধূতি পাঞ্চাবি দেখে অবাক হয়েছেন! হাহাহা!… আসলে সে এক কাণ্ড মশাই- আমার নাতনীর জেদ, হ্যালোইন পার্টিতে যেতে হল নাকি সাজগোজ করা চাই- আমার কি সে বয়স বলুন! শেষে দেখি মমি সাজাবে বলে ব্যান্ডেজ নিয়ে হাজির নাতনী- আজকাল বাচ্চারা কিরকম নাছোড়বান্দা তো জানেনই…আমি ভাবি যতি অপদেবতাই সাজতে হয় তবে বিলিতি কেন- এত দেশি থাকতে! অগত্যা ধূতি পাঞ্জাবী নিয়ে গলিয়ে নিলাম- নাতনীকে বোঝাতে নাতনীও খুশি- শুধু খালি গা-এ থাকা তো যায়না এই ঠাণ্ডায়- তায় আমার আবার একটু অ্যাজমার সমস্যা- কিন্তু এই দেখুন পৈতে অব্দি পরে এসেছি…
ভদ্রলোক পাঞ্জাবীর ভেতর থেকে পৈতেটা সত্যি সত্যিই বার করে দেখালেন আমায়। মুখে বাচ্চাদের মতন উত্তেজনা…
- পৈতে পরা ভূত!?…
-আমার এখনও যেন কোথায় আটকাচ্ছে… ভদ্রলোক এবারে রীতিমত শাসন করে দিলেন-
- আরে একি মশাই! আপনি দেখছি বেজায় বেরসিক- ব্রহ্মদত্যির নাম শোনেননি! তাঁর তো এই ট্রেডমার্ক পোশাক! শুধু পাঞ্জাবীটাই যা এক্সট্রা পরেছি। ভুত-এর এত সহজ ড্রেস কোড আপনি খুঁজে দেখান দেখি…
আমি হেঁসে বলি-
- এবার মনে পড়েছে… তা আপনাকে দিব্যি মানিয়েছে কিন্তু…আসলে বহু বছর আগে গল্প-টল্পতে পড়েছিলাম তো-মনে ছিলনা। এমনিতে ভূত-টুতে ভয় পেতে ভালোই লাগে-কিন্তু যেহেতু বিশ্বাস করিনা ফলে অত মনে থাকেনা…
- ও! তাই বুঝি! আপনি কি তাহলে কিম্ভুত! ভূতে ভয় পান অথচ বিশ্বাস করেননা!?
ভদ্রলোকের কথাবার্তায় একটা রসবোধ আছে। আমি হো হো করে এক প্রস্থ হেঁসে নিয়ে উত্তর দিই-
- আজ্ঞে না! ভয়টা রোম্যানটিসিজমের কারণে ভালো লাগে বোধ হয় কিন্তু যেহেতু জাতে কট্টর নাস্তিক- ভগবানে যখন বিশ্বাস করিনা, ভূতে কি করে করি বলুন!
আমার কথা শেষ হতেই ভদ্রলোকের মুখটা এবার দুম করে যেন কিরকম হয়ে গেল- আলো নিভে গেলে হয় যেমন। সদাহাস্য গালদুটো একটু শক্ত হল যেন। বাগানের বাঁদিকে ঝোপঝাড়ের কাছে বেশ কয়েকটা জ্বলন্ত নাক-চোখ ওয়ালা রাক্ষস মুখো হ্যালোইন স্পেশাল কুমড়োর লন্ঠন সাজানো ছিল। এগুলোকে স্থানীয় ভাষায় জ্যাক-ও-ল্যান্টার্ন বলা হয়। ভদ্রলোক সেইদিকে কিচ্ছুক্ষণ চুপচাপ তাকিয়ে থেকে একটা শব্দ করে দীর্ঘনিশ্বাস ফেললেন। আমি নীরবতা ভঙ্গের চেষ্টায় এবং ভদ্রতা রক্ষার খাতিরে জিজ্ঞেস করলাম-
- আপনি খেয়েছেন কিছু? স্কচ নেবেন? আমার স্টাডিতে গিয়ে বসতে পারি আমরা…
ভদ্রলোক যেন আমার কোনও কথাই শুনতে পেলেন না। ঐ দিকে তাকিয়েই একটা সম্পূর্ণ অন্য গলায় বললেন-
- অমলকান্তিও ঠিক এই কথাটাই বলত।
- অমলকান্তি?
আমার গলায় অবধারিত প্রশ্ন। ব্রহ্মবাবু এবার আমার দিকে তাকালেন। দৃষ্টিটা এখন পাল্টে গিয়েছে। আমার ভেতরে সদ্য জন্মানো কৌতূহলটা-কে যেন উনি ধরে ফেলেছেন। ভদ্রলোক আপনমনে গল্প শুরু করলেন-
- আসলে নিখিলেশ চলে যাওয়ার আগে অব্দি অমলকান্তি ঐ কথাই বলত। আর অমলকান্তি বলত মানে আমরাও তাই মেনে চলতাম। তখন বাহাত্তর সাল।কোলকাতা শহরের অগ্নুৎপাতের শেষ ক্ষণ। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী, রুনু গুহ নিয়োগী এবং আরও নানান অনুষঙ্গের দরুন আন্দোলনের আগুন নিভে যাবে আর কিছু দিনেই। আমার তখন ছাব্বিশ। আমি- নিখিলেশ- সত্যেন- কিশোরীলাল আর আমলকান্তি- আমাদের পঞ্চ পাণ্ডবের দল ছিল। আমাদের সকলেরই তখন রক্তের রঙ নকশাল। যে সময়ের কথা বলছি- অর্থাৎ বাহাত্তরের শেষের দিকে অবশ্য গুটিয়ে গিয়েছে আন্দোলন। ততদিনে নিখিলেশ আর নেই, ব্যারাকপুরে মাসির বাড়ির থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে মাথায়-মুখে এত গুলি করেছিল যে লাশ এসেছিল গলা থেকে পা-অব্দি। মাথাটা ছিল না বললেই চলে। একাত্তরের শেষের দিকের ঘটনা সেটা। নিখিলেশের মৃত্যুর পর আমরা কিরকম গুটিয়ে গিয়েছিলাম- হঠাত করে যে যার ভালো বুঝতে শুরু করলাম- এবং অমলকান্তিকে এক ভয়ানক জেদে ধরল। অমলকান্তি যদিও কখনও রোদ্দুর হতে চাইনি, তবে একই জীবনে অনেক কিছু হতে চেয়েছিল সে। হেন কোনও বিষয় ছিলনা যাতে অমলকান্তির বিদ্যার খামতি ছিল। মহাকাশ বিজ্ঞান থেকে অ্যালকেমি, ওসানোলজি থেকে তন্ত্র বিদ্যা ইত্যাদি। তা নিখিলেশের খুন হওয়ার পর এহেন অমলকান্তির ঘাড়ে চাপল প্রেতচর্চার নেশা। আমাদের মধ্যে নিখিলিশ আর অমলকান্তি-সব চেয়ে পুরনো বন্ধু ছিল- হরিহর আত্মা যাকে বলে। নিখিলেশ বাঙ্গাল- অমলকান্তি ঘটি। আমরা বলতাম বাঙ্গাল-ঘটির শ্রেষ্ঠ জুটি! সেই নিখিলেশের ওভাবে দুম করে চলে যাওয়াটা কোথাও গিয়ে মেনে নিতে পারেনি অমলকান্তি।তার তখন গোঁ- নিখিলেশের সাথে যোগাযোগ করেই ছাড়বে। যে ছেলে কমিইউনিস্ট ম্যানিফেস্টো হাতে ঈশ্বর আর ভূত কে সিগারেটের ধোঁয়ায় চাপিয়ে উড়িয়ে দিত- সে কিনা নিখিলেশের আত্মার অনুসন্ধানে পাগল হয়ে উঠলো। থিওসফিকাল সোসাইটি থেকে তান্ত্রিক কিছুই বাদ রাখল না। এদিকে আমাদের বাকিদের বাড়িতে তখন -যেন তেন প্রকারে কোলকাতা থেকে আমাদের তাড়ানোর ছক চলছে। এভাবেই কাটছিল দিন…
ব্রহ্মবাবু একটানা বলে থামলেন। এবার আমার দিকে সরাসরি চেয়ে জিজ্ঞেস করলেন-
- ঈশ্বরে বিশ্বাস করেননা- উৎসবে করেন?
- আজ্ঞে?
আমি একটু অপ্রস্তুত।
– এই হ্যালোইনের মতন আমাদের বাংলাতেও ভূত চতুর্দশী বলে এক পার্বণ আছে- প্রেতেদের পার্বন …জানেন তো? আর শুধু হ্যালোইন বা ভূত চতুর্দশী কেন- মেক্সিকানদের ডে অফ ডেড, জাপানীদের ওবোন, নেপালিদের গাই যাত্রা, বুদ্ধিস্ট ও তাওইস্ট-দের হাংরি গোস্ট ফেস্টিভাল… আর কত বলব…
-আপনি তো এ বিষয়ে পণ্ডিত মশাই!
আমি বলেই ফেলি।
-হ্যাঁ তা আপনি বলতে পারেন- পারাসাইকলজি নিয়ে বিগত চুয়াল্লিশ বছর চষে ফেলে- ওটুকু জ্ঞান অর্জন করতে পেরেছি মাত্র- কিন্তু কি মজার ব্যাপার জানেন?… অমলকান্তি না থাকলে আমি হয়তো এই নিয়ে পড়াশুনোই করতাম না… পারাসাইকলজি কি বিষয় জানেন নিশ্চয়ই?
– সহজ ভাষায় -অতিলৌকিক বিজ্ঞান?
– এই তো! একদম ঠিক… আমি মজা করে বলি অবশ্য প্রেত বিজ্ঞান!
– কিন্তু অমলকান্তির সঙ্গে আপনার প্যারাসাইকলজির যোগাযোগটা বুঝলাম না…
আমি কৌতূহল সামলাতে পারিনা।
-সেইটেই বলার। কেমন করে ঈশ্বরে বিশ্বাস না করা স্বত্বেও ভুত-প্রেতে বিশ্বাস করতে হয়, তা চোখে আঙুল দিয়ে- কিভাবে শিখিয়ে দিয়ে গিয়েছিল অমলকান্তি…
আমি ইতিমধ্যে একটা সিগারেট জ্বালিয়েছিলাম, ব্রহ্মবাবু গল্পে ফেরার আগে আমার থেকে একটা সিগারেট নিয়ে ধরিয়ে নিয়ে- এক দলা ধোঁয়া ছেড়ে ফের শুরু করলেন-
- তো সেটা সেই বাহাত্তরের কালি পুজোর রাত। কিশোরীলাল’এর মামা তাকে মুম্বই ডেকে নিচ্ছে- সে যাচ্ছে ডিসেম্বরে, সত্যেন নভেম্বরের শেষে যাচ্ছে আমেরিকা, আর আমার ভাগ্যে লন্ডন- যদিও আমার যাত্রা দেরি আছে। শুধু অমলকান্তি কোলকাতা ছাড়বে না। সেইসময় নিরাপত্তার কারণেই আমাদের একসাথে বসা হতনা। আমরা সুযোগ খুঁজছিলাম- অবশেষে মা কালী পথ দেখালেন। কিশোরীলাল-দের বাড়িতে বিশাল কালি পুজো হত- আর ফি-বছর কালীপূজোর রাতে ওদের উপরের চারতলার চিলেকোঠার ঘরে জড়ো হয়ে আমাদের পঞ্চ পাণ্ডবের জুয়া খেলা- ষাটের দশকের শেষের দিকে বাঁধা ছিল। সত্তর সাল থেকে নকশাল আন্দোলনের পত্তনকালীন সময়ে বছরখানেকের জন্য সেসব বন্ধ হয়- কিন্তু এবছর ঠিক হয় আবার বসবে সেই আড্ডা। সবাই শহর ছেড়ে চলে যাওয়ার আগে শেষ বারের মতন। সবাই এক কথায় রাজি হলেও অমলকান্তি বেঁকে বসল। কিন্তু অবশেষে তাকে রাজি করালো কিশোরীলাল। কালী পুজোর দিন রাতে আমরা যথা সময়ে জড়ো হলাম কিশোরীলাল-দের চিলেকোঠায়। রাত বাড়তে লাগলো। দেখতে দেখতে দেওয়াল ঘড়িটায় সশব্দে বারোটা বাজলো। কিন্তু অমলকান্তি?
…এখনও মনে আছে, খয়রি রঙের একটা পাঞ্জাবী, নিচে একটা সুতির কালো প্যান্ট- গলায় একটা ঘিয়ে মাফলার। মাথার চুল বরাবরের মতন উষ্কখুষ্ক নয়- বরং শান্ত ভাবে আঁচড়ানো, দাড়িটা কামানো। অমলকান্তি এসে ঢুকলো এবং তাঁর মুখে এক গাল হাসি। নিখিলেশ-চলে যাওয়ার পর অমলকান্তি-কে ঐ বোধ হয় প্রথম হাসতে দেখলাম আমরা।
কিশোরী বলল-
-কি ব্যাপার মাইরি! একেবারে বাবু হয়েছিস যে! হাঁসি ধরছে না তো মুখে!
আমলকান্তি মুখের হাঁসি গালে জিইয়ে রেখেই বসল নিজের চেয়ারে। আমি বললাম-
-ব্যাপার কি বলত? কোনও ভালো খবর?
সত্যেন বাটি থেকে মুড়ি নিয়ে মুখে চেলে দিয়ে দুবার চিবিয়ে, লঙ্কায় কামড় দেওয়ার ফাঁকে ফোড়ন কাটল-
-নির্ঘাত কাল ভূত চতুর্দশীর রাতে নিখিলেশের দেখা পেয়েছে!
যেইনা বলা- অমলকান্তি মুড়ির বাটি উল্টে লাফিয়ে গিয়ে জাপটে ধরল সত্যেন-কে, তার মুখে অবিশ্বাস জড়ানো উত্তেজনার হাঁসি!
-তুই কি করে জানলি!
অমলকান্তির গলা থেকে ঝরে পড়ছে আনন্দের স্রোত! এবার আমাদের সত্যিই অবাক হওয়ার পালা। সত্যি-ই অবশেষে দেখা পেয়েছে সে নিখিলেশের!?… ইতিমধ্যেই যথারীতি রহস্য জমাট বেঁধে গিয়েছে আমাদের তিনজনের মধ্যে- সঙ্গে শত প্রশ্ন… বিধান দিল স্বয়ং অমলকান্তি। মুড়ির বাটি টাটি গুছিয়ে- আমরা সবাই থিতু হয়ে বসতেই শুরু হল তার রহস্য উন্মোচন-
- দ্যাখ তোরা খুব ভালো করেই জানিস ভগবান-ভূত কোনও কিছুতেই আমার কোনোদিনই বিশ্বাস তো ছিলই না-বরং অবজ্ঞা ছিল বেশি। কিন্তু নিখিলেশের ব্যাপারটা আমি কোথাও গিয়ে মেনে নিতে পারিনি- তোদের কাউকে খোলসা করে বলতে পারিনি কিন্তু যেদিন ওর ফ্যাকাশে ছিন্ন বিচ্ছিন্ন লাশ-টা দেখি – বিশ্বাস করতে পারছিলাম না, ওর মতন অমন একটা জুয়েল ছেলে এভাবে আছে থেকে নেই হয়ে যেতে পারে… বাস্তবকে মানতে পারছিলাম না বলেই পরাবাস্তবের দিকে ঝুঁকলাম বলতে পারিস- কিন্তু একটা কথা বুঝেছিলাম যে- ‘নেই’ নামক সত্যি-টাকে মেনে নিয়ে বেঁচে থাকার থেকে ‘হয়তো আছে’-ভেবে নিলে, বাঁচাটা অনেক সহজ হয়…
অমলকান্তি একটু থেমে একটা সিগারেট ধরালো। কিশোরী’র আর তর সইছেনা যেন, সে বলে বসে-
- উফফ! এত গৌরচন্দ্রিকা না করে আসল ব্যাপারে আয়না! কোথায় দেখা পেলি ??! বলল কি সে!?
কিশোরীর উত্তেজনা দেখে আমি চোখ রাঙিয়ে চুপ করতে বলি- কখন পাছে অমলকান্তির মতি গতি পালটে যায়। সে খামখেয়ালি ছেলে। তবে অমলকান্তির এসব কিছুই কানে ঢুকল না। সিগারেটে টান দিয়ে সে ফের শুরু করল-
- তা নিখিলেশ-কে খুঁজতে থিওসফিকাল সোসাইটি থেকে অঘোর বাবার আশ্রম, পীর বাবা’র দরগা থেকে প্ল্যানচেট- কিছুই যে বাকি রাখিনি, তা তোদের কাছে বলাই বাহুল্য। কিন্তু কোথাও কোনও কিছুর ইঙ্গিত পাইনি কখনও। যেখানে গেছি সেখানেই নয় বুজরুকি নয় বিজ্ঞান-কে প্রেততত্ত্ব হিসেবে চালানো। অবশেষে গত হপ্তার শনিবার রাতে এক তান্ত্রিকের ঠেক থেকে ফিরে মনে মনে ঠিক করলাম এই খোঁজ বন্ধ করতে হবে- সম্ভবত সত্যিই ভূতপ্রেত বলে কিছু নেই। এত গরু-খোঁজা খোঁজার পরও যখন দেখা মিলল না তখন নিশ্চয়ই ওসব গাঁজাখুরি-মন ভুলনো বুজরুকি … বেশ বিরক্ত হয়েই সে’রাতে ঘুমোতে গেলাম। কিন্তু সেই রাতেই একটা স্বপ্ন দেখে মাথা ঘুরে গেল! অবশ্যি দেখার চেয়ে শুনে মাথা ঘুরে গেল বলা শ্রেয় কারণ কি দেখেছিলাম তা পরদিন সকালেও মনে ছিলনা ; কিন্তু কি শুনেছিলাম তা এখনও স্মরণ করতে পারি- নিখিলের গলা। স্পষ্ট। বেশ হাঁসি মাখানো গলায় সে আমাকে বলল-
- ওরম উল্টোপাল্টা জায়গায় যাস কেন! ওদের সাথে আমাদের কোনও সম্পক্ক নাই। ওসব ভড়ং শুধু। তুই একটা কাজ কর- এই কৃষ্ণপক্ষের ভূত চতুদ্দশীর রাতে- মানে কালী পূজা’র আগের দিন, আমাদের নিয়তিপুর গ্রামে চলে আয়। দেখা সাক্ষাত তো হবেই, উপরি তোর নিয়তিপুর দর্শন-ও হবে। এ জায়গায় এলে যে তোর কি ভালো লাগবে তা শুধু আমিই জানি। কারণটা এখন বলছিনা, এলেই বুঝতে পারবি। যদিও সেখানে আমি এখনও পা-রাখিনি তবে মরার পর থেকে সে জায়গার বহু গল্প শুনেছি- এবং এও খবর পেয়েছি যে শহিদ কোটায় আমার জায়গা সেখানে পাকা। তাই এই কমাস ধরে এই বৈতরণী ঘাট স্টেশনে পড়ে আছি ভূত চতুর্দশীর অপেক্ষায়, তো যাই হোক- বাকি বৃত্তান্ত এলে পরেই বলব-এখন বোঝাতে গেলে মহাভারত হয়ে যাবে… এবার কি করে আসতে হবে সেইটে বলি। ভূত চতুর্দশীর দিন, রাত্তির ঠিক ন’টা ছয়-এ শে’লদার বারো নম্বর প্ল্যাটফর্ম থেকে একখান গাড়ি ছাড়বে- নাম দেখবি বৈতরণী এক্সপ্রেস। উঠে পড়বি। টিকিট কাটতে লাগবে না। ঐ ট্রেন লাস্ট স্টপেজ দেবে গিয়ে এই বৈতরণীঘাট স্টেশনে-যেখানে এখন আমি আছি, প্ল্যাটফর্মে আমি নিজেই থাকবো। তারপর স্টেশন থেকে বেরিয়ে বৈতরণী নদী পেরলেই নিয়তিপুর-একসাথেই যাবো আমরা সেখানে। ক্যামন? নিয়তিপুর গ্রাম- বৈতরণীঘাট ইস্টিশন-শে’লদা- রাত ন’টা ছয়- প্ল্যাটফর্ম বারো- বৈতরণী এক্সপ্রেস-মনে করে…
হুবহু যেন নিখিলেশের গলায় কথা গুলো বলে একটু থামলো অমলকান্তি। ভর অমাবস্যা। নিচে পুজো শুরু হল ঢাক বাজিয়ে… বলির পাঁঠার ম্যা ম্যা আওয়াজ-টা এই উপরতলা অব্দি আসছে। এই ঘরে অবশ্যি শ্বাস প্রশ্বাস ছাড়া আর কোনও শব্দ নেই। সত্যেনও মুড়ি চিবোনো বন্ধ করে দিয়েছে। টিকটিক করে ঘড়ির নিয়মমাফিক আওয়াজ চলছে কেবল। আমরা সবাই তৃষ্ণার্তের মত অমলকান্তির দিকে তাকিয়ে- এরই মধ্যে সত্যেন মুখ ফসকে সুর করে বলে বসল-
– ন’টা ছয়ে নয় ছয়!? খুবই ইঙ্গিতপুর্ন সময়! …
এবার কিশোরী সত্যেন-কে চোখ রাঙিয়ে চুপ করিয়ে- অমলকান্তির দিকে ফিরে খুব মিহি করে বলল-
-তারপর?
অমলকান্তি এবারও বোধ হয় সত্যেন-এর কথা শুনতে পারেনি। সিগারেট-টায় শেষ টান দিয়ে আস্ট্রেতে গুঁজে সে ফের শুরু করল-
-তারপর আরকি! গতকাল যথাসময়ে পৌঁছে গেলাম শিয়ালদা স্টেশনে। ঠিক ন’টা ছয়ে বারো নম্বর প্ল্যাটফর্মে এসে দাঁড়ালো বৈতরণী এক্সপ্রেস।রাত ন’টাতেও দেখলাম প্ল্যাটফর্ম-টা জনশূন্য। যাকগে- আমি উঠে পড়লুম ট্রেনে। লোকাল ট্রেন। জানলার ধারে একটা সিট দেখে বসে পড়লুম। মিনিট দশকের মধ্যেই ট্রেন ছেড়ে দিল…ট্রেন ছাড়তে, লক্ষ করলাম আমার কোচে আর কেউ নেই। কে জানে কতক্ষণ লাগবে পৌঁছতে- হাওয়াও দিচ্ছিল দারুণ- চোখ লেগে কখন ঘুমিয়ে পড়লাম খেয়াল নেই… ঘুম ভাঙলো একটা গোলযোগে। অন্তত কয়েক হাজার লোকের একসাথে কোলাহল- ধড়ফড় করে উঠে দেখলাম ট্রেন থেমে আছে এক স্টেশনে- স্টেশনটা ঝলসে যাচ্ছে আলোর রোশনাই-এ। বৈতরণী ঘাট স্টেশন। সিট ছেড়ে দরজা দিয়ে স্টেশনে পা-দিতেই যা দেখলাম তার ব্যাপকতা মুখে ব্যক্ত কতটা করতে পারবো জানিনা, তবু চেষ্টা করছি মাত্র … সেদিন স্বপ্নে নিখিলেশের বিবরণ শুনে কেন জানিনা বৈতরণী ঘাট স্টেশনের যে মানচিত্র মনে মনে করেছিলাম তার আদল কতকটা বিভূতিভূষণের ‘চাঁদের পাহাড়’-এ শঙ্করের সেই পাণ্ডব বর্জিত স্টেশনের মতন। কিন্তু ওখানে নেমে যা দেখলাম- তা ঠিক তার উল্টো। বিশাল এক স্টেশন, মোগলসরাইয়ের একশো একুশ গুন তো বটেই। প্ল্যাটফর্মের শুরু-শেষ বলে কিছু নেই। যেদিকে চোখ যাচ্ছে থিক থিক করছে মানুষ, রিফিউজিদের মত স্টেশন দখল করেছে তারা। কিন্তু এগুলো মানুষ কি?… কিম্ভুত মার্কা তাদের সব চেহারা, দেখলে গা শিরশির করে। বুঝলাম যে এরা নিশ্চয়ই- সকলেই ভূত-প্রেত… নিখিলেশের মতন। যেদিকে চোখ যায় সেখানেই এই ভূতপ্রেতদের জনস্রোত। এবার সামনের দিকে তাকিয়ে দেখি- স্টেশন থেকে ঐ জনস্রোত উপচে গিয়ে ঠেকেছে এক প্রকাণ্ড নদীর ঘাটে। স্টেশন পেরিয়ে দুরে দেখা যাচ্ছে সেই নদী- যার পাড়ে জ্বলা বিরাট বিরাট হ্যালোজেন স্তম্ভের আলোয় দেখা যাচ্ছে নদীর জলের রঙ- লাল, যেন রক্তের নদী। এই তবে বৈতরণী? সেই নদীর ঘাটে বাঁধা সারি সারি নানা রকমের নৌকোতে-ভূত-প্রেতেরা লাইন দিয়ে উঠছে। সেই লাইনে দাঁড়ানোর হুটোপুটিতেই শোরগোলটা দ্বিগুণ হয়েছে। তাছাড়া বিভিন্ন মাইকে বিভিন্ন ব্যক্তির নাম আনাউন্স করা হচ্ছে, সঙ্গে তাদের মৃত্যুদিন এবং সেই মৃত্যুদিন অনুযায়ী ভূত হিসেবে জন্মানোর পর তাদের রাশি-গন-নক্ষত্র- ইত্যাদি বিচার করে তবেই এক একজনকে এক একরকম নৌকোতে উঠতে দেওয়া হচ্ছে … পুরো পরিস্থিতির সাথে যদি মানসচক্ষে দেখা কোনও জায়গার তুলনা দিতেই হয়, তবে গাঙ্গাসাগর মেলার কথা বলবো, কিন্তু আয়তন ও কোলাহলে তার অন্তত সাতানব্বই গুন বেশি… তা এহেন দৃশ্যের বিস্ময় কাটিয়ে উঠেই যে চিন্তাটা ঘিরে ধরল, সেটা হল এই লক্ষলক্ষ ভূত-প্রেতের মধ্যে নিখিলেশ-কে খুঁজবোটা কি করে!?…
স্টেশনের দক্ষিণ দিকে শৌচালয়ের পাশে একটা হেল্প ডেস্ক মত দেখে এগিয়ে গেলাম- এখানেও লাইন পড়েছে। রোগা, লম্বা, কানা-খোঁড়া নানা আকারের ভূতের লাইন। ভূতের গায়ে যে গন্ধ হয় সেটা জানতাম না, ভূতের ভিড়ে ঠেলাঠেলি করতে গিয়ে সেই গন্ধে প্রায় প্রাণ ওষ্ঠাগত হল। এদের সবার গায়ের থেকেই কিরকম চিটে গুড়ে গাঁদা ফুল ভিজিয়ে রাখলে যেমন গন্ধ হয়- তেমনি একটা উৎকট গন্ধ বেরুচ্ছে। তা যাইহোক- এমার্জেন্সি বলে লাইন অগ্রাহ্য করে পাশ থেকে মুখ বাড়িয়ে দেখি হেলথ ডেস্কে বসে আছে এক কঙ্কাল। কঙ্কাল-ও একপ্রকারের ভূত বটে। আমি জিজ্ঞেস করলাম-
- বলছি কি দাদা- আমার বন্ধু নিখিলিশ কোঙ্গার- খুঁজে পাচ্ছিনা, একটু যদি আনাউন্স করে ডেকে দ্যান…
হাড় ঠকঠকে আওয়াজ সহ উত্তর এল-
- নিখিলেশ কোঙ্গার নামে এবছরে মৃতের সংখ্যা তিন। জন্মদিন- অর্থাৎ মৃত্যুদিন, রাশি-গোত্র-লগ্ন-নক্ষত্র বলুন- নইলে ঘোষণা অসম্ভব…
এবার আমি পড়লাম ফাঁপরে, মৃত্যুদিন-টা জানলেও বাকি কিছুই তো জানিনা- ওদিকে লাইনে দাঁড়ানো ভূতেরা আমাকে ঠেলে সরিয়ে দিয়েছে ততক্ষণে… এবার কি করব-তাই নিয়ে আকাশপাতাল ভাবতে ভাবতে নদীর দিকে এগোচ্ছি, এমন সময় দেখলাম সামনের ভিড় ঠেলে ছুটতে ছুটতে আমার দিকে এগিয়ে আসছে নিখিলেশের মুণ্ডহীন দেহ। দুর থেকে আমায় দেখতে পেয়েই উত্তজনায় -অমল- অমল! করে চেঁচাতে চেঁচাতে এগিয়ে এসেই জড়িয়ে ধরল আমায়। এতক্ষণ কাতারে কাতারে ভূত দেখে আমার কোনও ভয় ডর কিছুই যেন নেই ততক্ষণে- তবে একটা মুণ্ডু বিহীন শরীর জড়িয়ে ধরলে একটু অসোয়াস্তি তো থাকেই। লক্ষ করলাম ওর পরনে খুনের দিনের সেই পোশাক-ই বটে। তবে মাথা যখন নেই- কথা বলছে কি করে?… কোলাকুলি সেরেই এক পা পিছিয়ে যায় নিখিল। আমার মনের প্রশ্ন যেন বুঝে ফেলে, কাটা গলা’র জায়গাটায় হাত বুলোতে বুলোতে চুকচুক করে একটা শব্দ করে বললে-
-ওহো! বলাই তো হয়নি তোকে- আমি মরে স্কন্ধকাটা হয়েছি যে-আসলে মাথাটা ছিল না তো… হেঁহেঁ!
আমিও ঠিক কি উত্তর দেব বুঝতে না পেরে মজা করার ভঙ্গীতে জুড়ে দিলুম-
-একটা নতুন দৃষ্টিভঙ্গী পেয়েছিস বল?… কি ভালো লাগছে তোকে দেখে ভাই…
– ভালো বলে ভালো! কতদিন পর… আর?… বাকিরা সব?… ভালো তো?
-হ্যাঁ রে সবাই ঠিকঠাক! ওরা তো সবাই বাইরে চলে যাচ্ছে-
-আর তুই?
-আমি এখানেই থেকে যাবো ঠিক করেছি!…
-বেশ করেছিস! তা এখন চল! দেরি হয়ে যাচ্ছে-তাছাড়া জলসাও শুরু হয়ে যাবে … এরপর নৌকা পাওয়া যাবেনা- নৌকোয় উঠে বাকি কথা…
আমরা এতক্ষণে এদিকে বাকরুদ্ধ। বিস্ময়ের বাঁধ এতটাই ভেঙ্গেছে যে স্কন্ধকাটা-রুপী নিখিলেশের বিবরণ শুনেও একে ওপরের দিকে মুখ চাওয়াচাওয়ি করতেও ভুলে গেছি। ওদিকে অমলকান্তি বলে চলেছে-
– ভয়-ডর-আতঙ্ক- অবিশ্বাস- বিস্ময় ইত্যাদি সব বোধ ততক্ষণে আমার বোধ হয়ে লোপ পেয়েছে। কি নিয়তিপুর- কেনই বা সেখানে আমায় নিয়ে যাচ্ছে নিখিলেশ- কিসেরই বা জলসা-কেনই বা নিখিলেশ নিজে এখানে- সব মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে তখন। এরপর নৌকায় উঠে, বৈতরণীর রক্ত গঙ্গার করাল স্রোতে দোল খেতে খেতে নিখিলেশের কাছে পুরো বৃত্তান্ত জানতে পারলাম। ব্যাপারটা সংক্ষেপে বললে অনেকটা এইরকম-
মৃত্যুর পর আপামর বাংলা ও বাঙ্গালী ভূত-প্রেতকূলের বাসস্থান হল এই নিয়তিপুর। তবে মরলে পরেই টপ করে এখানে এসে জুড়ে যাওয়া যাবে- ব্যাপারটা অতটাও সহজ নয়। এক নির্দিষ্ট নিয়মের আবর্তে চলে নিয়তিপুরের নিয়ম- মৃত্যুর পরে সদ্য টাটকা ভুত-কে অপেক্ষা করতে হয় পরবর্তী ভূতচতুর্দশী অব্দি। এই ভূত চতুর্দশীর রাতে তাদের বৈতরণী এক্সপ্রেস ধরে আসতে হয় এই বৈতরণী ঘাট স্টেশনে। আগেও চলে আসা যেতে পারে কিন্তু সেক্ষেত্রে অপেক্ষা করতে হবে ঐ স্টেশনে- যেমনি করে বহু ভূত এবং নিখিলেশ নিজেই এসে রিফিউজির ন্যায় অপেক্ষায় ছিল। তাছাড়া – বছরের একমাত্র এই রাতেই নৌকা চলাচল সার্ভিস চালু থাকে বৈতরণীতে। এই রাতেই, নিয়তিপুরের জন্য যোগ্য ভূতেরা নৌকো চেপে নদী পেরিয়ে গিয়ে নিয়তিপুরে ঠাই পায় এবং অযোগ্যেরা বৈতরণীর করাল গ্রাসে তলিয়ে গিয়ে পায় ভোগান্তি- অর্থাৎ পুনর্জন্ম। আবার এইদিন-ই নিয়তিপুর গ্রামের শোধন-যোগ্য অপরাধী ভূত-প্রেতদেরও বাৎসরিক মৃত্যুদণ্ড হিসেবে, বৈতরণীর জলে ফেলে পুনর্জন্ম দান করা হয়। তাছাড়া শোধন-অযোগ্য অপরাধী ভুতেদের তেলের কলে পিষে আলকাতরা বানিয়ে- মনুষ্য জগতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
তবে এক্ষেত্রে শোধন-যোগ্য ভুতেদের শাস্তি হিসেবে পুনর্জন্ম দান করা হয় কেন- সেটা বুঝতে অবশ্য যেতে হবে নিয়তিপুর গ্রামে। বলা হয় নাকি- একবার যে ভূত নিয়তিপুরে ভূত অবস্থায় জীবন কাটিয়েছে- তার মনুষ্য জন্মের পরেও নাকি সংসারে মন টেকেনি…এমনই টান নিয়তিপুরের! আসলে নিয়তিপুরে এক স্বর্গীয় সাম্যবাদ বিরাজ করে। যে কমিউনিজম নিয়ে আমরা আপ্রাণ লড়েছি সেই কমিউনিজমের আপ্লাইয়ড ল্যান্ড নিয়তিপুর… যেখানে সবার ঘরের মাপ এক। সবাই পরম সুখে বাস করে এবং এটা দেখাতেই নিখিলেশের আমাকে নিয়ে আসা। গল্পের রাজনীতির বাস্তবক্ষেত্র-এই নিয়তিপুর- ভূত চতুর্দশীর রাতে, বছরের এই একটা দিনে গোটা ভূতপ্রেত কূল যেখানে মেতে ওঠে। জ্যান্ত বাঙ্গালী মানুষদের সব থেকে বড়ো উৎসব যদি দুর্গা পুজো হয়- তবে বাঙ্গালী ভুতেদের হল এই ভুতচতুর্দশির রাতের উৎসব। যাকে নিয়তিপুরের সব চেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ ব্রহ্মদৈত্য তথা নিয়তিপুরের অভিভাবক ব্রহ্মবাবা- নাম দিয়েছেন- প্রেত পার্বন। ব্রহ্মবাবার বয়স হাজার হাজার বছরেরও উপরে,কারুর ঠিক মত জানা নেই। এখানকার সাম্যবাদের প্রবর্তক-ও তিনিই। এই নিয়তিপুরের মাঝামাঝি এক বিরাট মাঠ- যার নাম কিনা ব্রহ্ম বাবা এককালে এক গল্প পড়ে খুশি হয়ে রেখেছিলেন ভুশুণ্ডির মাঠ- সেখানেই বিশাল মঞ্চ করে আয়োজিত হয় প্রেত পার্বণের অনুষ্ঠান সূচি…ব্রহ্মবাবা নিজে দাঁড়িয়ে থেকে অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন। অনুষ্ঠান শেষে এক এলাহি ভোজেরও আয়োজন করা হয়। প্রতি বছর প্রেত পার্বণের নির্দিষ্ট অতিথি দেশ থিম হিসেবে থাকে- যেমন এবছরের থিম জাপান। এছাড়াও এই দিন এই মাঠেই বসে বিশাল এক মেলা -যেখানে থাকে ঝুলন্ত নাগরদোলা-উড়ন্ত জাহাজের মতন নানান মজার আয়োজন, অসংখ্য খাবার দাবার ও হরেক মালের দোকান। তবে উৎসবের নাম প্রেত পার্বণ হলেও- এদিন সারা বাংলা ও পৃথিবীর নানান অতিলৌকিক সদস্যেরাও ভিড় জমান এই জমায়েতে…ব্রহ্মবাবার আহ্বানে।
এই অব্দি বলে থেমে ফের একটা সিগারেট ধরিয়ে নেয় অমলকান্তি। আমরা সকলেই সিগারেট খেলেও যেন প্যাকেট থেকে নিয়ে ধরানোর ক্ষমতাও নেই এখন। পাথর হয়ে তাকিয়ে আছি অমলকান্তির দিকে। অমলকান্তি সিগারেটে লম্বা টান দিয়ে ফের শুরু করে-
- তা নিখিলেশের শহিদ কোটার নৌকোতে আমরা সুস্থ ভাবেই পেরিয়ে এলাম বৈতরণী। কিন্তু নৌকো নিয়তিপুরের ঘাটে লাগতেই আমার চক্ষু চড়কগাছ! ভূতেরা-মানুষের থেকে সব দিক থেকেই এগিয়ে-এরকম একটা থিয়োরি গল্পের বইতে পড়েছিলাম কিন্তু সেই মুহূর্তে- হাড়ে হাড়ে টের পেলাম। আলোয়-আয়োজনে-সাজসজ্জায় প্রেত পার্বণের জৌলুস- মনুষ্য সমাজের যেকোনো পার্বন-কে ছাপিয়ে যায় অনায়াসে। আর এ কিরকম গ্রাম! এই গ্রামের মাটি-গাছপালা-আকাশ কোনও কিছুর সঙ্গেই মনুষ্য সমাজের কোনও কিছুর মিল নেই…যেন এচেনা অজানা গ্রহতে গিয়ে নেমেছি। অন্ধকার আকাশে আতশবাজির বন্যায় – যেন অরোরা বোরিয়ালিস ফুটে উঠেছে! ঘাটে পা রাখতে না রাখতেই মাইকে আবহ সঙ্গীতের সুর বেজে উঠলো আর আমি বিস্ময় কাটিয়ে উঠবার আগেই নিখিলেশ আমার হাত ধরে দৌড় লাগালো… কিন্তু একি! আমি দৌড়চ্ছি- না উড়ছি!… যেতে যেতে চারিধারে লক্ষ করি- সারিসারি এক মাপের বাড়ি- অথচ অদ্ভুত কায়দায় একটির থেকে অন্যটি সম্পূর্ণ ভিন্ন সাজে সেজে- ঘরে ঘরে হরেক রকমের আলো আর পিদিম… ওভাবে কিছুক্ষণ দৌড়ে কিম্বা উড়ে যে জায়গায় এসে দাঁড়ালাম সেটা কোলকাতার ময়দানের তুলনায় অন্তত একশো একান্ন গুন বড় বললেও কম বলা হয়। এই মাঠের ঠিক মাঝখানেই মঞ্চ। আমরা দাঁড়ালাম মঞ্চ থেকে ত্রিশ হাত মত দুরে- এখানে নবাগত ভুতেদের জায়গা করা হয়েছে। চারদিকে তাকিয়ে দেখি পিল পিল করছে ভুত-প্রেত। তাদের নানা- আকার, নানা- জাত নানা পরিধান। জন্তু জানোয়ারের ভূতেরাও আছে- আমি সেই দিকে তাকিয়ে অবাক হতেই নিখিল কানে কানে জানায়- যে এদেরও পুনুর্বাসনের ব্যবস্থা করা হয় এখানে। বন্য জন্তুরা যায় নিয়তিপুরের জঙ্গলে আর পুষ্যিরা বেছে নেয় তাদের প্রিয় ভূত প্রভুদের…জন্তু-জানোয়ারের এই ভুতেদের গোদানু বলে। তাছাড়া মশা-মাছি, পোকা-মাকড় সব কিছুরই ভূত আছে এখানে… নিখিলের কথা শেষ হতে না হতেই সত্যিই বোঁবোঁ শব্দ করে একটা মশার ভূত কামড়ালো আমার কানের পিছনে আর অমনি মঞ্চে শুরু হয়ে গেল উদ্বোধনী সঙ্গীত-
ধা-তিনা- না-তিনা
চালাকি বুঝিনা
গেলে প্রাণপাখি
খাঁচায় খুজিনা
ধা-তিনা- না-তিনা
না-তিনা-ধা-তিনা
ধা-তিনা- না-তিনা
না-তিনা-ধা-তিনা
মিলে মিশে থাকি
মাছে শাকে ঢাকি
মনে মনে জপি
মরে যেন থাকি
ধা-তিনা- না-তিনা
না-তিনা-ধা-তিনা
ধা-তিনা- না-তিনা
না-তিনা-ধা-তিনা
বেলা শেষ হলে
শুরু হয় খেলা
মরে গেলে পরে
নেই হেলা ফেলা
ধা-তিনা- না-তিনা
না-তিনা-ধা-তিনা
ধা-তিনা- না-তিনা
না-তিনা-ধা-তিনা…
শাঁখচুন্নির গলায় উদ্বোধনী সঙ্গীত শেষ হতেই খড়মের শব্দ তুলে এবার মঞ্চে উঠে আসেন এক বৃদ্ধ নাদুস নুদুস ভদ্রলোক, পরনে ধূতি, গায়ে পৈতে, মাথায় টাক, কুলোর মত কান, মুলোর মত দাঁত, চোখ গুলো উজ্ঝল সাদা – নিখিলিশ ইশারায় বলে- ব্রহ্ম বাবা! ব্রহ্ম বাবা মঞ্চে এসে মাইকের সামনে দাঁড়িয়ে গলা ঝাড়েন এবং শুরু করেন তাঁর বক্তৃতাঃ
- নমস্কার! নিয়তিপুরের বর্তমান অধিবাসীবৃন্দ – নবাগত প্রেতগন এবং দেশ বিদেশের অতিথিগন- সকলকে জানাই প্রেত পার্বণের প্রীতি, শুভেচ্ছা এবং আন্তরিক অভিনন্দন। আজ কৃষ্ণপক্ষের এই পুণ্য তিথিতে আমরা প্রতি বছরের ন্যায় এবছরও প্রেত পার্বণের আয়োজন করতে পেরে গর্বিত। সবার আগে এই অনুষ্ঠানের পরিচালক হিসেবে আমার নিজের পরিচয়-দেওয়া প্রয়োজন। আমি একজন নিতান্ত ব্রহ্মদৈত্য- বয়সের দিক থেকে এই নিয়তিপুরের সর্ব গরিষ্ঠ সদস্য হওয়ার সুবাদে আমি এই নিয়তিপুরের একজন বৃদ্ধ অবিভাবক হওয়ার সুযোগ পেয়েছি মাত্র। এছাড়া যারা জানেন-না তাদের জানান দেওয়ার জন্য বলে রাখা ভালো যে আমাদের এই নিয়তিপুরে সম্পূর্ণ সাম্যবাদ বিরাজ করে। তাই নবাগতদের মূলত বলে রাখা যে- পিছনের ফেলে আসা পৃথিবীর পরিচয়-মর্যাদা সব কিছু আপনাদের ঐ বৈতরণীর জলে বিসর্জন গিয়েছে বলেই আপনারা আজ এই নিয়তিপুরের মাটিতে এসে দাঁড়াতে পেরেছেন…
ব্যস! ফেটে পড়ে হাততালিতে …এরপর বক্তৃতা শেষ হলে, ব্রহ্মবাবা বাংলার ভূতকূলের সকল সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ ভূত-প্রতিনিধিদেরকে একে একে মঞ্চে ডেকে উত্তরীয় দান করে সম্মান জ্ঞ্যাপন করেন। তারপর সেই ভূত-প্রতিনিধিটি নবাগতদের মধ্যে থেকে তাঁদের সম্প্রদায়ের লোকজনদের বেছে নেয়। সমগ্র ভুত-প্রেতকুলের মধ্যে সবার প্রথমে আসে উল্টো দিকে গোড়ালি ওয়ালা অবিবাহিতা শ্রেণীর স্ত্রী-ভূত-পেত্নী। হাততালি শিষে ফেটে পড়ে যুবা ভূত মহল। পেত্নী-টি প্রথমে সম্মাননা গ্রহণ করেন। তারপর নবাগতদের মধ্যে থেকে পেত্নীদের শনাক্ত করে-তাদেরকে পেত্নী হিসেবে অভিষিক্ত করে মঞ্চ ত্যাগ করেন…এভাবেই চলতে থাকে নবাগতদের অভ্যর্থনা পর্ব। এরপর একে একে আসে মুসলমান ভূত মামদো, মাছ খেকো মেছো ভূত, মুণ্ডুহীন ভূত স্কন্ধকাটা, লাল পেড়ে শাড়ি আর হাতে শাঁখা পরা সধবা স্ত্রী-ভূত শাঁকচুন্নি, চোর বা চোরের বৌয়ের ভূত চোরাচুন্নি, পথিক-কে পথ ভোলানো ভূত কানাভুলো, রাতের ত্রাস নিশি, রক্তপিপাসু ভ্যাম্পায়ারের বাঙালি সংস্করণ পিশাচ, নির্যাতিত স্ত্রী’র হাঁড়া ভূত, জলে ডুবিয়ে মারতে পারদর্শী ভূত দেও, বাঘের হাতে মৃত বেঘো ভূত, জঙ্গলের ভূত পেঁচাপেঁচি, ডাইনি বুড়িদের অনুগতশ্রেণির ভূত ডাকিনী…এছাড়াও একানড়ে, হাঁকাবুড়ো, ঘ্যাঁঘো, জুজু, লুল্লু, যক্ষ, বেতাল আরও অসংখ্য প্রায়। ব্রহ্ম বাবা বললেন-
-এভাবেই ভূতের প্রকার ভেদ বেড়ে চলবে, অতচ ঐক্যতা-সাম্যতা বজায় থাকবে- এটাই আমাদের কাম্য!
অবশেষে ব্রহ্ম বাবা নিজে ব্রহ্মদৈত্যদের প্রতিনিধিত্ব করে- নবাগতদের শ্রেণীকরণ অধ্যায় শেষ করলেন। এরপর শুরু হল- সকল নবাগত ভুতেদের একে একে একটি নতুন বাড়ীর চাবি, এক সেট নতুন বস্ত্র ও একটি করে রেশন কার্ড বিতরণ। নিখিলেশও সানন্দে মঞ্চে উঠে ব্রহ্ম বাবা’র হাত থেকে নিজের অধিকার গ্রহণ করল। আমার ভেতরের বামপন্থি-সাম্যবাদী রক্তচাপ ততক্ষণে আনন্দে চোখে জল এনে দিয়েছে… যাই হোক, এভাবেই একে একে বিতরণ পর্ব শেষ হল। এরপর এবছরের থিম জাপান হওয়ায়- জাপানী ভুতেদের এবছরের প্রতিনিধি ফুতাকুচি ওনা-কে মঞ্চে ডেকে নিয়ে গলায় উত্তরীয় পরিয়ে এবং হাতে ঘেঁটু ফুলের তোড়া তুলে দিয়ে সম্মান জ্ঞাপন করলেন ব্রহ্মবাবা- ফুতাকুচি দেবী তার অলৌকিক ক্ষমতা দেখাতে দর্শকের দিকে পিছন ঘুরে দাঁড়াতেই তার মাথার চুল গুলো সাপের কুণ্ডলিনীর মতন পেঁচিয়ে ফণা হয়ে উঠলো- ও মাথার পিছনে ভয়ঙ্কর দাঁতে ঠাঁসা একটা মুখ দেখা দিল। দর্শকের মধ্যে হাততালি ফেটে পড়লো। ব্রহ্মবাবা ফুতাকুচি দেবীর পিছনের সেই ভয়ানক মুখে রসগোল্লা পুরে দিয়ে জাপানী ভঙ্গীতে প্রণাম করলেন- এবারে চুলের ফণা নামিয়ে ফুতাকুচি দেবীও হাস্যমুখে রসগোল্লার সুখ্যাতি করে হাত জোড় করে প্রণাম করে জানালেন যে তার বাংলায় আসতে পেরে খুব ভালো লাগছে। এবারে একে একে অন্যান্য দেশের প্রতিনিধিরাও মঞ্চে উঠে অভ্যর্থনা গ্রহণ করতে শুরু করলেন। মিশরীয় মমি, ইটালির ফ্রাঙ্কেনস্টাইন, নেপালের কিচকান্দি, লন্ডনের ব্লাডি মেরী, আইরিশ ব্যানশি ছাড়াও ওয়ারউলফ, ড্র্যাকুলা, গবলীন, পিভস, ব্ল্যাডি ব্যারন, ডিমেন্টরস, গ্রান্ডেল প্রমুখ- সকলেই একে একে মঞ্চে সম্মানিত হলেন এবং ব্রহ্মবাবা নিজে হাতে সকলকে রসগোল্লা খাইয়ে আপ্যায়ন করলেন। এরপর শুরু হল সুদীর্ঘ বিনোদন অনুষ্ঠান। ম্যাজিক থেকে শুরু করে নাচা-গানা কিছুই বাদ পড়লনা।
এই ফাঁকে আমিও একটু মেলা ঘুরে দেখতে বেরিয়ে পড়লাম…মঞ্চ পেরিয়ে একটু ডান দিকে যেতেই ভাসমান নাগরদোলা-টা চোখে পড়লো। বিদ্যুৎ ছাড়াই চলছে। পাক খাওয়ানোর দায়িত্বে আছে তালগাছের মত লম্বা একানড়ে এবং গেছো ভূতেরা। তারা যে কি জোরে জোরে পাক খাওয়াচ্ছে নাগরদোলাটাকে সে বলার নয়। আমি এগোতে লাগলাম। কিছু এগোতেই সে কতরকম-এর দোকান। পর পর চুড়ির দোকানে দেখলাম শাঁকচুন্নি- চোরাচুন্নি- পেত্নীদের কাড়াকাড়ি লেগেছে। বেশ কয়েকটা জুজু ও ঘ্যাঁঘোদের খেলনার দোকানও চোখে পড়ল। মেলার উত্তর দিকে একদল ব্রহ্মদৈত্য জিলিপি-মণ্ডা-মিঠাইয়ের দোকান লাগিয়েছে। তার উল্টো দিকে মামদো ভূতেরা দিয়েছে আচারের দোকান। মেলার এক কোনায় এক বিশাল তাঁবু খাটিয়ে সার্কাস লেগেছে, সেখানে বেঘো ভূতেরা বাঘের ভূতের খেলা দেখাচ্ছে। আমি একটা মেছো ভূতের চপের দোকান দেখে সেদিকে এগিয়ে গেলাম, কাদাচিংড়ির চপ ভাজছে গরমগরম- একটা নিয়ে মুখে দিতেই প্রাণ ভরে গেল। ওদিকে ইতিমধ্যে মাইকে যে পাখোয়াজের আওয়াজটা শুরু হল সেটা খুবই চেনা! কবছর আগেই সিনেমাহলে তিন-চার বার শুনেছি। আমি চপ হাতে মঞ্চের দিকে ছুটলাম। বছর তিনেক আগে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’-চলচ্চিত্রে দেখানো ভূতের নাচকে কুর্নিশ জানিয়ে নিয়তিপুরের ভূত মহল এক প্রস্থ নাচ মঞ্চস্ত করল। আর এই নাচ দিয়েই শেষ হল অনুষ্ঠান।…
এবার ভোজের পালা। তবে সবশেষে ঐ খাওয়ার আয়োজন দেখে আমি বাক্যহারা… খাঁটি বাঙ্গালী মতে পাত পেড়ে খাওয়ার ব্যবস্থা। কলার পাতা- আর মাটির ভাঁড়ে পাত পড়েছে পাশাপাশি- একদল খাচ্ছে- আবার একদল পরিবেশন করছে। আর এক একখানা উপকরণ কি! তুলাইপাঞ্জি চালের হীরের দানার মত গরম ভাত, উষ্ণ ঘন ঘি, চোদ্দ রকম শাক, তেত্রিশ রকমের ভাজা, ঘোড়ার ডিমের ডেভিল, একুশ রকমের মাছের মাথা দিয়ে ডাল, ছিয়ানব্বই রকম পদের নানান মাছের ঝাল-ঝোল-কালিয়া-অম্বল, খাসির ভূতের মাংস, তেঁতুল গাছের ছায়ার চাটনি-সঙ্গে পাঁপড়, জুতোর সোলের মতো মোটা স্বরওয়ালা দই এবং নিয়তিপুর-খ্যাত ভূতরামের নিজে হাতে বানানো তিনশো পঁয়ষট্টি রকমের মিষ্টি। আহা… আমি এমনিতে খুব একটা খাইনা কিন্তু কিকরে যে তিন বার ভাত নিয়ে ফেললাম- কি বলবো… আমিও খেতে খেতে যেন আর মানুষ থাকলাম না! উফফফ… আর মিষ্টি! কিছু মিষ্টির বাহার দেখলাম জীবনে…আর এভাবে কখন যে পুরো পার্বণটাই কেটে গেল টেরই পেলাম না। খেয়ে উঠে তৃপ্তিতে পেটে হাত বুলোতে বুলোতে খেয়াল হল যে ভুলেই গিয়েছিলাম, বাড়ি ফিরতে হবে- নিখিলেশ-কে বিদায় জানাতে গেলে সে বললে-
-সে আমি নিজে গিয়ে ভোর রাতের ট্রেনে তোকে তুলে দিয়ে আসব’খন… তার আগে ব্রহ্মবাবার সঙ্গে একবার দেখা করে আয় গে যা- ওনার অনুমতিতেই এই প্রেত পার্বণ দর্শন হল কিনা…
নিখিলেশের কথা মত ব্রহ্মবাবার কুটিরে এসে হাজির হলাম। ভোজের পরে তিনি তখন গদিতে হেলান দিয়ে থেলো হুঁকো টানছেন, আমি ঢুকতেই এক দৃষ্টে চেয়ে রইলেন আমার দিকে -মঞ্চে দুর থেকে দেখে কিছু না মনে হলেও এখন ওনাকে দেখে গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠলো। আমি মাথা নত করে হাত জোড় করে প্রণাম করলাম। ভদ্রলোকের গায়ের থেকে সাদা আলোর যেন জ্যোতি বেরুচ্ছে । সাদা জ্বলন্ত দৃষ্টিহীন চোখে আমার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে মুলোর মতো বিশাল দাঁতগুলো বার করে এক গাল অমায়িক হেঁসে জলদ গম্ভীর গলায় বললেন-
- তা কেমন লাগলো বাবা সব কিছু?
- জন্মজন্মান্তরেও ভুলিব না!
আমি আহ্লাদে বঙ্কিম হয়ে গেলাম। ব্রহ্ম বাবা জোরে হেঁসে বললেন-
- সে তো নিশ্চয়! সে তো নিশ্চয়! হেঁহেঁ…
আমি বলি-
- আমাদের মানুষের পৃথিবীতে যে উচ্চ-নিচ্চ ভেদ আমরা দুর করতে পারলাম না- হয়তো কেউই কোনোদিন পারবেনা- সেইটে আপনি এই নিয়তিপুরে সম্ভব করেছেন- এর চেয়ে বড় কিছু আর-
আমি শেষ করার আগেই ব্রহ্মবাবা বললেন-
- আরে আমি নিমিত্ত মাত্র হে। মানুষ জীবিত থাকতে যে মনুষ্যত্ব বোধ মৃত হয়ে থাকে, সে মরে এখানে এলে সেই বোধ জাগিয়ে তুলতে সক্ষম হয়েছি মাত্র-
আমি ব্রহ্ম বাবা’র প্রেমে ততক্ষণে হাবুডুবু খাচ্ছি রিতিমতন। চোখের জল মুছে প্রণাম করে বললাম-
- জানিনা কদ্দিন বাঁচবো, যদি মরি তবে স্বর্গে যেন না যাই- আপনার এই নিয়তিপুরে যেন আসতে পারি- এই আশীর্বাদ করুন…
উত্তরে ব্রহ্ম বাবা কিছু না বলে স্রেফ মুচকি হাসলেন। আর সেই হাসিমাখা সৌম্য-স্নিগ্ধ ভয়ঙ্কর মুকখানা বুকে নিয়ে-নিখিলেশ’কে বিদায় জানিয়ে ফিরে এলাম কোলকাতায়।… আমার আর সত্যিই দুঃখ কষ্ট কিছু নেই রে আর… নিখিলিশের সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে এই ব্রহ্মবাবার সাকুল্যে ও নিয়তিপুরের রূপ দেকে আমি এখন এই শহর- এই রাজনীতি- এই অমানবিক মানুষদের থেকে অনেক মুক্ত বোধ করছি…
অমলকান্তি তার বক্তব্য শেষ করল। চিলেকোঠার ঘরে আমরা সবাই চুপচাপ, আমার মাথায় তখন একটাই প্রশ্ন ঘুরছে- মানে, সবই বুঝলাম কিন্তু- যে নিয়তিপুরে ভূতদেরও এতো কাঠখড় পুড়িয়ে যেতে হয় সেখানে অমলকান্তি জ্যান্ত ঘুরে আসলো-টা কিভাবে? সেই ব্রহ্মবাবা-ই বা তাকে আলাউ করলো কেন?… এসবই এলো পাথাড়ি ভাবছি এবং ভাবছি আদৌ প্রশ্নটা অমলকান্তি-কে করা ঠিক হবে কিনা, ইতিমধ্যে- মাঝখান থেকে সত্যেন হঠাত জ্যাঠামো করে- ঠাট্টার সুরে বলে বসল-
- আচ্ছা, তোর ঐ ব্রহ্মবাবা’কে কি কোনও ভাবে কার্ল মার্ক্সের মত দেখতে ছিল?
কথা শেষ করে মাথা নিচু করে ছিল অমলকান্তি, সত্যেন-এর এই অকারণ ঠাট্টায় হঠাত করেই ছিটকে উঠে দাঁড়িয়ে একটা জ্বলন্ত দৃষ্টিতে সত্যেন-এর দিকে তাকিয়ে ঝড়ের মতন ঘর থেকে বেরিয়ে গেল সে। আর আমরা থতমত হয়ে বসে থাকলাম…নিচে পাঁঠার ম্যা ম্যা-টাও হঠাত থেমে গেল এবার- উলুধ্বনি উঠলো… বোঝা গেল- যে বলি সাঙ্গ হয়েছে…
থামলেন ব্রহ্ম বাবু। আমি কবে শেষ এত মন দিয়ে কোনও মানুষের মুখে গল্প শুনেছি মনে পড়েনা- সেই ছোটবেলায় শেষ বোধ হয়। ইতিমধ্যে ব্রহ্মকমল বাবুর মুখে অমলকান্তির গল্প শুনতে শুনতে যে বহুক্ষণ কেটে গেছে তা বলাই বাহুল্য। বাগানের নাচানাচি-টা এখন ঘরের ভিতরে ঢুকে হচ্ছে। স্ত্রী এসে কিছু খাবার দাবার-জলও দিয়ে গেছে- কিন্তু তাতে না উনি হাত লাগিয়েছেন না আমি। আমি ওনার দিকে জলের গ্লাসটা এবার এগিয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করলাম-
- এখানেই গল্প শেষ?! ভূতের গল্পের শুনেছি উপসংহার খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়!
ভদ্রলোক জলস্পর্শ না করেই একই সুরে বললেন-
- ঠিকই শুনেছেন। আর সেই গুরুত্বপূর্ণ খবরটা আমি পেয়েছিলাম দুদিন পরে। আমার সেই কালী পুজোর রাতের প্রশ্ন গুলোর উত্তরও পেয়ে গিয়েছিলাম সেই খবর থেকেই। খবরটা বাড়ী বয়ে এনেছিল সত্যেন, হাতে একটা খবরের কাগজ তুলে দিয়ে সে জানালো যে – যেদিন রাতে কিশোরীলাল-দের চিলেকোঠায় অমলকান্তি আমাদের সঙ্গে বসে দুটো আস্ত সিগারেট পুড়িয়ে আড্ডা মেরে গিয়েছিল- সেদিনই সকালে শিয়ালদার স্টেশনের কারশেড থেকে- রামপুরহাট লোকালের একটা কম্পার্ট্মেন্টে জানলার ধারের সিটে অমলকান্তি-কে ঘুমন্ত অবস্থায় পাওয়া গিয়েছিল- আর তার গলায় ছিল দুটো বুলেট মার্ক । তার তখন পরনে ছিল খয়রি রঙের একটা পাঞ্জাবী, নিচে একটা সুতির কালো প্যান্ট- গলায় একটা ঘিয়ে মাফলার। পরদিন পোস্ট মর্টেম রিপোর্টে আরও গুরুত্বপূর্ণ যে ব্যাপারটা জানা গেল -তা হল, লাশ ডিটেক্ট করার আগের দিন রাতে- অর্থাৎ ঐ ভূত চতুর্দশীর রাতে- ঐ ন’টা দ’শটা নাগাত পুলিশের এনকাউন্টারে- গুলি খেয়েই ঘুমিয়ে পড়েছিল অমলকান্তি- ফলে সেই ঘুম থেকে তাকে আর কখনও তোলা যায়নি।… এঘটনা শুনে কালীপুজোর রাতের প্রশ্নের উত্তর আমি পেয়ে গিয়েছিলাম- যে কেন ব্রহ্মবাবা অমলকান্তিকে সাদরে আমন্ত্রণ করে নিয়ে গিয়েছিলেন সেই রাতে। কিন্তু সেই বাহাত্তর সালের কালী পুজোর রাতে আমরা কার সাথে বসে – কার কাছ থেকে প্রেত পার্বণের গল্প শুনেছিলাম-তার উত্তর আমরা কেউই কখনই পাইনি। শুধু কিশোরীর চিলে কোঠার আস্ট্রেতে- দুটো আস্ত সিগারেট গোঁজা অবস্থায় পাওয়া গিয়েছিল বলে জানতে পেরেছিলাম…এরপর তিয়াত্তরে দেশ ছেড়ে এই বিলেতে এসে এই এত বছর ঐ প্রেত বিজ্ঞান তথা প্যারাসাইকলজি নিংড়িয়েও সেই উত্তর পাইনি… শুধু একটাই কথা, নাস্তিক হয়ে ভগবানে বিশ্বাস করিনা বলে ভূতেও করিনা- এই কথাটা আর কাউকে কোনোদিন বলতে পারিনি- অমলকান্তিও বলতে পারেনি আর কখনও নিশ্চয়… আর এবার আপনি দেখুন, আজ থেকে আপনি বলতে পারবেন কিনা-
কথা শেষ করতে না করতেই ভদ্রলোকের ভয়ঙ্কর কাশি শুরু হল। আমি জল এগিয়ে দিতে- জল না খেয়েই উঠে পড়লেন-
- আসলে সিগারেট খেয়ে ফেলেছি তো- ইনহেলারটা আবার ফেলে এসেছি- আমি এক কাজ করি বুঝলেন- ইনহেলারটা বরং নিয়ে আসি-পাশেই বাড়ি…
কাশির ফাঁকে ফাঁকে কথাগুলো বলতে বলতেই ভদ্রলোক উঠে পড়ে লিভিং রুম দিয়ে সদর দরজা খুলে বেরিয়ে গেলেন। ওনার এই অকস্মাৎ আড্ডায় যবনিকা পতনে একটু আশ্চর্যই হলাম। অদ্ভুত লোক কিন্তু- না মানে গল্পটা ভালোই বানিয়ে বলেন, যদিও সম্পূর্ণই আষাঢ়ে এবং গাঁজাখুরি মেশানো- তাও উনি কি’করে যে ভাবলেন এই গল্প বলে উনি আমাকে ভূতে বিশ্বাস করিয়ে দিয়ে যাবেন তা উনিই জানেন। এর থেকে অনেক ভয়ঙ্কর গল্প আমি আগেও মানুষের মুখে শুনেছি, আমার ভদ্রলোকের জন্য একটু মায়াই হল যেন- বেচারা কত বাক্য ব্যয়ই না করলেন- আমার ভূতে বিশ্বাস জন্ম দেওয়ার জন্য! …
-বাবা!!
ভদ্রলোকের কথা ভাবতে ভাবতেই আনমনে লিভিংরুমের মাঝামাঝি চলে এসেছিলাম প্রায়, কন্যা শ্রুতির চিৎকারে হুঁশ ফিরল।
-Where were you! কোথায় ছিলে এতক্ষণ!?
আমি খুব স্বাভাবিক ভাবেই উত্তর দিলাম-
- এই তো- তোর বন্ধু এশানা-ও’র দাদুর সাথে গল্প করছিলাম। বাকিয়ার্ডে । কেন কি হয়েছে?
- Who’s Dadu? Who is Eshana!?
এবার অবাক হওয়ার পালা আমার-
- Eshana-your friend? তোর বন্ধু বললেন তো… এই পাড়ায় থাকে-
- I don’t have any friend named Eshana Baba! এশানা-টা আবার কে! আর এই পাড়ায় I don’t have any friends–don’t you know! কি বলছ বল তো!
আমি চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকি-সত্যিই তো শ্রুতির যে এ পাড়ায় কোনও বন্ধুবান্ধব নেই সেটা আমি জানতাম বটে, মাথায় ছিল না… কিন্তু তাৎক্ষনিক ভাবে ব্যাপারটা চাপা দেওয়ার জন্য বলি-
- Oho! My mystake… আমি নামটা ভুলে গ্যাছি I guess-অন্য কেউ হবে। তুই যা বন্ধুদের সাথে গল্প কর- আমি একটু উপরে যাচ্ছি…
মেয়ে শ্রুতি আবার পার্টির ভিড়ে মিশে যেতেই আমি পড়ি- কি মড়ি বাগান লাগোয়া বারান্দায় এসে আস্ট্রেটা হাতে তুলে নিতেই আমার মাথা-টা ঘুরে যায় যেন এক পাক। ভদ্রলোক যে সিগারেটটা একটু আগে খেয়ে নিজে হাতে স্টাব করে গিয়েছিলেন- সেটা একটা আস্ত সিগারেট হয়ে পড়ে রয়েছে আস্ট্রেতে-ঠিক সেই অমলকান্তির সিগারেট দুটোর মতই।
চারিদিকের কোলাহল অজান্তেই যেন নিস্তব্ধতায় পরিণত হয়। আস্ট্রে-টা নামিয়ে রেখে গোটা সিগারেট-টা হাতে নিয়ে কোন এক ঘোরের মধ্যে স্টাডিতে উঠে আসি আমি। অ্যাটিকের কাচের জানলাটা আবার ফাঁক হয়ে খুলে গেছে, সেখান থেকে নদীর দিককার একটা ঠাণ্ডা হাওয়ার স্রোত-সশব্দে ঢুকে আসছে ঘরে। আমি কাচটা বন্ধ করার জন্য সেদিকে এগিয়ে যেতেই জানলা দিয়ে যেটা চোখে পড়ে-তাতে জীবনে প্রথমবার, মুহূর্তের মধ্যে -বাংলা সাহিত্যের সব ভূতের গল্পের সেই বিখ্যাত ঠাণ্ডা বরফের স্রোত শিরদাঁড়া বেয়ে নেমে যায় আমারও। জানলা দিয়ে স্পষ্ট দেখি, কিছুক্ষণ আগে পাশে বসে থাকা ব্রহ্মকমল বন্দ্যোপাধ্যায়-এখন খালি গায়ে থেমসের তীরের অন্ধকারে দাঁড়িয়ে আমার দিকে স্থির দৃষ্টিতে চেয়ে রয়েছেন, অমলকান্তির সেই ব্রহ্ম বাবার বিবরণের সঙ্গে হুবহু মিলে যাচ্ছে এই রূপ- এখন তার কান গুলো কুলোর মত, দাঁত গুলো মুলোর মত, চোখ দুটো উজ্ঝল সাদা আলোয় জ্বলছে এবং ঐ ঘুটঘুটে অন্ধকারের মধ্যেও যেন সাদা জ্যোতি বেরোচ্ছে তাঁর গা দিয়ে। বেশ কিচ্ছুক্ষণ আমার দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে ব্রহ্ম বাবু থুড়ি ব্রহ্ম বাবা থেমসের জলের উপরে জমে থাকা রাতের কুয়াশায় মিলিয়ে গেলেন চোখের সামনে। আর অমনি আমার গায়ের লোম গুলো আমার অজান্তেই খাঁড়া হয়ে উঠে দাঁড়াল- আর হঠাত থেমস-কে যেন মনে হল সেই অমলকান্তির বৈতরণী নদী, যার ওপারে নিয়তিপুর গ্রাম- যেখানে এই হ্যালোইনের রাতে ব্রহ্মবাবাকে অতিথি হিসেবে পেয়ে আরেক শাঁকচুন্নি গান ধরেছে-
“কুমড়োর ছেঁচকি আর ভাজা চোদ্দ শাক, ভ্যাম্প্যার আর ব্রহ্মদত্যি পেট পুরে খাক”…
সমাপ্ত

Abhinandan Banerjee
Abhinandan Banerjee is an Indian film director, creator, screenwriter, author, illustrator and graphic designer. His debut feature The Cloud & The Man (Manikbabur Megh), which is based on ‘abstract reality’, is set for its world premiere at 25th edition of Tallinn Black Nights Film Festival this year.









