Notice: Function _load_textdomain_just_in_time was called incorrectly. Translation loading for the htmega-pro domain was triggered too early. This is usually an indicator for some code in the plugin or theme running too early. Translations should be loaded at the init action or later. Please see Debugging in WordPress for more information. (This message was added in version 6.7.0.) in /home4/rohitifo/glocalcharcha.in/wp-includes/functions.php on line 6170

Warning: session_start(): Session cannot be started after headers have already been sent in /home4/rohitifo/glocalcharcha.in/wp-content/plugins/htmega-pro/includes/helper-function.php on line 39
ফিল্ম অ্যাক্টিভিস্ট ও চলচ্চিত্র-চিন্তক ল্যাডলী মুখোপাধ্যায়ের জীবন ও কাজ নিয়ে দীর্ঘ সাক্ষাৎকার – GloCal Charcha
Warning: Undefined array key "options" in /home4/rohitifo/glocalcharcha.in/wp-content/plugins/elementor-pro/modules/theme-builder/widgets/site-logo.php on line 93

ফিল্ম অ্যাক্টিভিস্ট ও চলচ্চিত্র-চিন্তক ল্যাডলী মুখোপাধ্যায়ের জীবন ও কাজ নিয়ে দীর্ঘ সাক্ষাৎকার

আলাপচারিতা ও গ্রন্থণায় সুপর্ণা ঘোষ  

তিনি ল্যাডলী মুখোপাধ্যায় – গত ২৫ বছর ধরে নিরলসভাবে কাজ করে চলেছেন বিভিন্ন দিকে। একদিকে তিনি যেমন চিত্র-পরিচালক, সিনেম্যাটোগ্রাফার, অন্যদিকে তেমনই তিনি একজন অসাধারণ লেখক ও শিক্ষকও বটে। তথ্যচিত্রকার হিসেবে তাঁর ঝুলিতে রয়েছে দুশোরও বেশি ভিন্ন স্বাদের তথ্যচিত্র। যার বেশ কয়েকটির জন্য তিনি পেয়েছেন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মানের সম্মান। জাতীয় সংস্কৃতি মন্ত্রকের সিনিয়র ফেলো মানুষটি কিন্তু আশৈশব বামপন্থী পারিবারিক ঐতিহ্যে লালিত।

তাঁর ক্যামেরায় ধরা পড়ে প্রান্তিক জীবন ও লৌকিক সংস্কৃতির কথা, তাঁর কলম চলে মানুষের অধিকারের দিকগুলি নিয়ে। শিল্পী হিসেবে তাঁর শ্রেণী (বাংলা ভাষায় বামপন্থী ধারার চর্চার প্রেক্ষিতে যদি শব্দটির দ্ব্যর্থবোধকতা স্মরণে থাকে) আলাদা মাত্রা এনে দেয়। সম্পূর্ণ নিজস্ব অভিজ্ঞতা থেকে তাঁর সাহসী ধারাবাহিক কলাম ‘উদাসী বাবার আখড়া’ ২০১৩ সালে পপ্যুলেশন ফার্স্ট**(Population First) প্রদত্ত মিডিয়া অ্যাওয়ার্ডে সম্মানিত হয়েছে।  

কর্মসূত্রে বহুল অভিজ্ঞতা সম্পন্ন ল্যাডলী মুখোপাধ্যায় আজ তাই বাংলার এক মাইলস্টোনের নাম। নীচে রইল, আমার সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ লিখিত কথোপকথনের সম্পূর্ণ পাঠ।

সু।ঘো – একেবারে শুরুর কথা দিয়েই শুরু করা যাক ল্যাডলী দা। আপনার জন্ম, ছোটবেলা, পড়াশুনা, মা-বাবা, তাঁদের কথা, পরিবার, এই জীবন কেন বেছে নিলেন – অনেকগুলো প্রশ্ন মাথার মধ্যে কিলবিল করছে। কিছুটা বলবেন আমাদের?

ল্যাডলী মুখোপাধ্যায় – আমার জন্ম কলকাতার বেহালা অঞ্চলের এক বামপন্থী পরিবারে। ছোটো বেলায় যাকে দুষ্টুমী বলে , বড়বেলায় তাইই যেমন বাঁদরামি হয়ে যায়, আমার ক্ষেত্রেও তেমনটি ঘটেছে। পড়াশুনায় আমি যেমন ভালো ছিলাম তেমনি প্রথাগত পাঠ্যাভ্যাসে আমার মন ছিল না। ফলে ইস্কুল শেষ হতে না হতেই নিজেকে সরিয়ে নিয়েছিলাম। তার অবশ্য একটা রাজনৈতিক কারণও ছিল। সে সময় নকশালপন্থী আন্দোলনের ছায়া আমাদের মননেও পড়েছিল, সেই কম বয়সে, কাঁচা মনে। তো সে যাই হোক মূলধারার লেখাপড়া ছেড়ে তখন আমি নিজের মতো করে পড়ছি। পড়ছি সাহিত্য, রাজনীতি, অর্থনীতি, ইতিহাস ও সমাজতত্ত্ব এবং যার ফলে বাবার সঙ্গে অবধারিত সংঘাতে অত্যন্ত কম বয়সেই আমি বাড়ির বাইরে …

এরপর রাহুল সংকৃত্যায়ণের ভবঘুরে শাস্ত্রকে অবলম্বন করে এক লম্বা ভবঘুরে জীবন। কখনো কোনো বন্ধুর আস্তানা তো কখনো বস্তিবাসী।কখনো বাসের কন্ডাক্টর তো কখনো সারা রাত ট্যাক্সি চালাই। তবে এতো কিছু সত্বেও বাড়ির সঙ্গে সম্পর্ক সাধারণ ভাবে ভালোই ছিল। আমার পরিবার হয়তো চেয়েছিল আমাকে ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার করতে। কিন্তু আমার দিনযাপনের উপাখ্যান অন্য খাতে বাহিত হয়। আমি লিখতে চেয়েছিলাম,  ছবি করতে চেয়েছিলাম। আমার ফোকাস কখনো দিগ্ভ্রান্ত হয়নি। প্রত্যেকটি মানুষেরই কিছু ব্যক্তিগত চাওয়া পাওয়া থাকে , যেমন আমারও আছে। তবে আমি যা পেয়েছি (তা যত ছোটই হোক না কেন!) তাতেই আমি সন্তুষ্ট। এতটা না পেলেও কোনো ক্ষতি ছিল না।

সু।ঘো – আপনার এই কর্মজগতে আসা – আপনার তো বিশাল কর্মযজ্ঞ – নিজের কর্মক্ষেত্রের বাইরেও প্রচুর কাজের সাথে জড়িত, যেমন, বাউলদের নিয়ে, ছোটদের পড়াশুনো, চলচ্চিত্রচর্চা, তাদের সিনেমা দেখা,  সমাজসেবা , এগুলো নিয়ে একটু বলুন না গ্লোক্যাল চর্চা সিনেম্যানিয়ার পাঠকদের।

ল্যাডলী মুখোপাধ্যায় – নানাবিধ কাজের পরিসরে ঢুকে পড়া ছিল আমার অভ্যাস। যেমন বাউল গান শুনতে শুনতে কবে যে সে বিষয়ে গবেষণা করতে শুরু করলাম, আজ আর তা মনে পড়ে না। শুধু যে গবেষণা আর বই লেখা এবং ছবি তৈরি করা, তা নয় , বাউলবাউলানিদের ছেলেপুলের পড়াশুনার দায়ভারও নিয়েছি। কতটা কি করতে পেরেছি জানি না ,তবে আপ্রাণ চেষ্টা করেছি ওদের শরীর স্বাস্থ্য যাতে ঠিক থাকে। তার জন্য কত ডাক্তারবদ্যি ,হাসপাতাল আর প্রশাসনের দরজায় ঘুরতে হয়েছে তার ঠিক নেই।

হ্যাঁ, শিশু কিশোরদের নিয়ে কিছু কাজ করার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সৌজন্যে। বছর পাঁচেক আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব আয়োজন করা থেকে বেশ কিছু বই শিশু কিশোরদের জন্য প্রকাশ করা গেছে  , এমন কি, নিজেও বই লিখেছি , সম্পাদনা করেছি।। কলকাতা ও জেলায় সিনেমা সংক্রান্ত একটার পর একটা কর্মশালা সংগঠিত করার মধ্যে দিয়ে চলচ্চিত্র চর্চা-প্রসার শিশু কিশোরদের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া ছিল মূল উদ্দেশ্য। খুবই সুনির্দিষ্টভাবে এগুলো করা গেছিলো এবং তার ফলও পাওয়া গেছে। গত পাঁচ বছরে সিংহভাগ প্রকাশনা নিঃশেষিত। এক একটি কর্মশালায় শিশু কিশোরদের যোগদান ছিল চোখে পড়ার মতো। আসলে যখন যেভাবে সুযোগ পেয়েছি কাজ করে গেছি।

সু।ঘো – খুব ভাল লাগল শুনে ল্যাডলীদা। এগুলো নিয়ে পরে আপনার থেকে আরেকটু জানব। কিন্তু তার আগে একটু অন্য প্রসঙ্গে আসি এবার, একেবারেই অন্য প্রসঙ্গ কিন্তু – শোনা গেছিল ২০১৩ সালে আপনি এবং কিছু টেকনিশিয়ন নিউ থিয়েটার ফিল্ম স্টুডিয়োতে কাজ থামিয়ে দিয়েছিলেন। বলেছিলেন টেকনিশিয়নদের নিয়মিত নিয়োগ সুনিশ্চিত করতে হবে, ক্যাজুয়াল হিসেবে আর রাখা যাবে না। সাথে এও বলেছিলেন যে, তাঁদের দৈনিক মজুরি ৫০% বৃদ্ধি করতে হবে। এ দিকে, টালিগঞ্জে এখন প্রচুর কর্পোরেট প্রোডিউসর এসে গেছেন, তার ওপর করোনা প্রকোপ। সবে মিলে, কী ভাবে দেখছেন বা ভাবছেন আজকের পরিস্থিতিকে?

ল্যাডলী মুখোপাধ্যায় – ছবি তৈরি শিখতে যাওয়ার প্রথম দিন থেকেই আমার সঙ্গে বাংলা ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির যোগাযোগ। নানা সময় নানা সংগঠনের পদাধিকারীও ছিলাম। টেকনিশিয়ানদের অর্থনৈতিক ও কর্মসংস্থানের উন্নতিই ছিল সেখানে মূল প্রতিপাদ্য। সেক্ষেত্রে নানা আন্দোলনে জড়িয়ে পড়তে হয়েছে। কোথাও খানিকটা দাবিদাওয়া মিটেছে, আবার কখনো আন্দোলন ব্যর্থ হয়েছে। যা হয় আর কি!

তবে ইন্ডাস্ট্রিকে কাছ থেকে দেখে বুঝতে পেরেছি যে অবস্থা বেশ বেসামাল। গত দশ বারো বছর ধরে ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির ক্রমে অধ:গমন আমাকে বিস্মিত করেছে। এক এক করে সিনেমা হলগুলো বন্ধ হয়ে গেছে। এসেছে মাল্টিপ্লেকস। অন্যদিকে কাজ কমেছে , ছবির বাজার নেই। টেলিভিশন চ্যানেলগুলো ধুঁকছে।

তার সঙ্গে যোগ হয়েছে করোনা পরিস্থিতি। বিনোদন শিল্প মুখ থুবড়ে পড়েছে। এই অবস্থা থেকে সিনেমাকে বাঁচাতে গেলে একদম ভিন্ন পরিকল্পনা দরকার,  দরকার এই শিল্পে লগ্নি ও সরকারি সহায়তা। অন্যথায় সিনেমা বলে কিছু থাকবে না। সমস্তটাই মোফোনসর্বস্ব হাতমক্সে পরিণত হবে। অথচ ফিল্ম শুধুমাত্র বিনোদনের বিষয় নয়। ফিল্ম মানে শিক্ষা, ফিল্ম মানে ইতিহাস,  ফিল্ম মানে সংরক্ষণও …

সু।ঘো – আর একটা প্রশ্ন আপনাকে অনেক দিন ধরে করার ইচ্ছে ছিল। টেলিভিশন জগতের অনেককেই আপনি বড় পর্দায় আসতে সাহায্য করেছেন। শুধু অভিনয়ই নয়, আপনি টেকনিক্যাল ডিরেক্টরের কাজ করেছেন ছোট পর্দায় – অভিনেত্রী নীলাঞ্জনা ঘোষ ও উৎপল দত্তের উপর করা ডক্যুমেন্টরিতে। ছোটপর্দা থেকে সিনেমা তো হচ্ছেই আজকাল, তা ছাড়া থিয়েটার জগৎ থেকে সিনেমা জগতে পদার্পন বা ট্রানজিশনই বলি বরং, তা’ও খুব সহজ হয়ে গেছে। এই ট্রানজিশন আপনি কী ভাবে দেখছেন? কতটা কঠিন বা কতটা সহজ?

ল্যাডলী মুখোপাধ্যায় –  প্রাথমিক ভাবে ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করতে এসে মূলতঃ সহকারীর কাজ দিয়ে শুরু করি। এর অনেক পরে নিজে ছবি করতে শুরু করি। ইতিমধ্যে চলে এলো প্রাইভেট টেলিভিশন চ্যানেল। তখন তাদের হয়েও নানা দায়িত্ব সামলেছি। বহু সিরিয়াল ও টেলিফিল্মও করতে হয়েছে। আসল বিষয় হলো কাজের পন্থা, তার লজিস্টিকস। কাজ করতে করতেই লক্ষ্য করছিলাম যে কর্মসংস্কৃতির মান ক্রমে অধঃপতিত। যেমন সিনেমা তেমনই সিরিয়াল। অথচ এই বাংলায় দারুণ সব টেলিফিল্ম ও সিনেমা হয়েছে। তার কারন তখনো পর্যন্ত এই কাজের একটা নির্দিষ্ট ডিসিপ্লিন ছিল , লোকে জেনে বুঝে আসতো। ডিরেক্টরদের ভাবতে হতো , লেখাপড়া করতে হতো। এখন তো সে সব বালাই গেছে। তবে থিয়েটার থেকে ফিল্ম বা সিরিয়াল থেকে ফিল্মে যাওয়া আসাটা কিন্তু নতুন কিছু নয়। সেদিক থেকে দেখতে গেলে তো রঙ্গমঞ্চ হলো অভিনয় শেখার আতুর ঘর। এমন বহু শিল্পী আছেন যারা সব মাধ্যমেই সাফল্য পেয়েছেন। এখন আসলে মধ্য মেধা বা আরো নিম্নগামী এক অশিক্ষিত গড্ডালিকায় আমরা নিমগ্ন। এর থেকে পরিত্রাণ চাই। নইলে সব নষ্ট হয়ে যাবে।

সু।ঘো –  বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আপনার বিভিন্ন কাজ রয়েছে বা করেছেন – সেই অভিজ্ঞতার কথা একটু বলবেন আমাকে? বিদেশের কাজের সঙ্গে এ দেশের কাজের তফাৎ কোথায়?

ল্যাডলী মুখোপাধ্যায় –  বিগত দেড় দু দশক ধরে প্রায় প্রতি বছরই যাচ্ছি বিদেশে যাচ্ছি , মূলত কাজের কারনে।নানা দেশের ফেস্টিভ্যালে ছবি দেখানো , শুটিং করা , কর্মশালা ও পড়ানো। বলতে বাধা নেই যে পাশ্চাত্যের কর্মসংস্কৃতি আমাদের সাথে প্রায় মেলেই না। সেখানে যে যার মতো কাজ করছে,ইচ্ছে মতো কাজ করছে। তেমন কোনো  নিয়ন্ত্রণ নেই। যেমন অধিকাংশ দেশে ছবি শেষে কোনো সেন্সর নেই। অথচ আমাদের দেশে ছবি তৈরি করতে গেলে নানা ভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়।

অনুমোদন নিতে হয় বিভিন্ন সংস্থার। তাদের চাপিয়ে দেওয়া নির্দেশ মেনে চলতে হয়। তারাই ঠিক করে কতজন কলাকুশলী কাজ করবে। আমার পাঁচ জনে কাজ চললেও পনেরোজনকে নিতে হবে। ফলে যথারীতি আর্থিক চাপে প্রথমেই কোমর ভেঙ্গে যায় পরিচালক প্রযোজকের। এবং এই নিয়ন্ত্রণ থাকে ক্ষমতায় থাকা রাজনৈতিক দলগুলো হাতে। বিদেশে এমন অবস্থা কল্পনাও করা যায় না।

তবে একটা কথা এখানে বলতেই হবে , তা হলো , সারা পৃথিবীতেই এক স্থূল মিডিয়ক্রিটির ঝড় বইছে। তার মধ্যেই কিছু চারা আর মহীরুহ গাছ ঠায় দাঁড়িয়ে আছে মাথা উঁচু করে। এটাই হয়তো আমাদের আশাবাদকে প্রলম্বিত করবে।

সু।ঘো – কর্মসংস্কৃতির প্রসঙ্গে বললেন বলে আর একটা প্রশ্ন মনে এল। আজকাল ছোটদের মধ্যে একটা প্রবণতা দেখা যাচ্ছে ফোটগ্রাফির – একটা ভাল ক্যামেরা থাকলেই তো আর ভাল ফোটোগ্রাফার হওয়া যায় না – আপনি তো এই বিষয় নিয়ে ক্লাসও করিয়েছেন। একজন ভাল ফোটগ্রাফার হতে গেলে শুরুতেই কী কী নজরে রাখতে হয়? আমাদের গ্লোক্যাল চর্চা সিনেম্যানিয়ার অনেক পাঠক, যারা নিজেরাও বাবা-মা, তাঁরা অনেকেই এই বিষয় নিয়ে আমাদের ওয়েবসাইটের সম্পাদকীয় নানা বিভাগে মূল্যবান মতামত পাঠিয়েছেন। আপনাকে কোনওদিন সেগুলো দ্যাখাব বা আমাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করব।

ল্যাডলী মুখোপাধ্যায় – ফটোগ্রাফি মায় সিনেমাটোগ্রাফির বয়স কম, অন্যান্য মাধ্যমের থেকে। কিন্তু যেহেতু এখন তা প্রযুক্তি নির্ভর হয়ে পড়ছে তাই বিষয়টির ব্যাপ্তি আকারে প্রকারে অনেকানেক বিস্তার পেয়েছে। আসলে ক্যামেরার কোনো টিপস হয় না।ওটা জানতে হবে , বুঝতে হবে , পড়তে হবে।অন্তরঙ্গ একটা সম্পর্ক তৈরি করতে হবে বিষয়ের সাথে , যন্ত্রটির সঙ্গে।

কোন ক্যামেরাতে ছবি তুলেছি তার থেকেও বড় প্রশ্ন হলো কি ছবি তুলতে চাই? কেন তুলতে চাই? তার পারপাস কি? ছবি হলো “পেইন্টিং অফ লাইটস”। কখনো ন্যাচারাল লাইট আর কখনো কল্পিত (আর্টিফিসিয়াল), বানানো লাইট। কি আমি চাইছি?

আজকে সারা পৃথিবীর সমস্যা হলো ই-বিভ্রাট। লক্ষ লক্ষ কোটি কোটি ছবি উঠছে মোফোনে আর তা নানা সার্ভার এবং অ্যাপসে জমা হচ্ছে। আমরা বুঝতে পারছি না যে এটা হলো ই-গারবেজ। ফলে কি ছবি তুলবো কেন তুলবো কিভাবে তুলবো তা আগে ভেবে নিতে হবে।

সবাই “কবি নয় কেউ কেউ কবি”র মতো সবাই চিত্রগ্রাহক নই , হয়তো কেউ কেউ !

সু।ঘো – এই করোনা পরিস্থিতিতে প্রায় ২ বছর কাজের ধরণই অনেক পালটে গেছে। মানুষের ভাবনাচিন্তার অনেক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে – এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টা আপনি কী ভাবে দেখছেন? সামগ্রিক ভাবে  চলচ্চিত্রচর্চায় এর প্রভাব কেমন?

ল্যাডলী মুখোপাধ্যায় – এই ভয়ঙ্কর অবস্থা সামগ্রিকভাবে এই পৃথিবীর অধিকাংশ দেশ নিরপক্ষ তাবৎ কর্মক্ষেত্রেই তার প্রভাব ফেলতে বাধ্য। সিনেমা বা অডিও ভিসুয়াল অনেক আগেই কোমায় যাওয়ার ব্যবস্থা শুরু করেছিল। করোনা তাতে সিলমোহর দিল। এখন চলছে স্রেফ বাঁচা মরার যুদ্ধ। শিল্প ও শিল্পীর কথা স্বভাবতই এখানে   অনেক পরের বিবেচ্য বিষয়। তার মধ্যেই বিনোদন ইন্ডাস্ট্রি থাকবে। মানুষের সংস্কৃতি বোধকে আরো নিম্নগামী করবে। আমরা আমাদের ঐতিহ্য হারাতে শুরু করবো। কেননা ব্যবসায়ীরা চিরকালই লঘু ও চটুল বিষয়কেই তাদের উপাদান হিসেবে ব্যবহার করে। করোনার ফলে মানুষ তার ইচ্ছে মতো সিনেমা নাটক দেখতে পারছে না (আমি হলগুলোর কথা মাথায় রেখে বলছি)। তার কোনো অপশন নেই।

রইলো পড়ে টেলিভিশন আর মোফোন। আর সেখানে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে একই বিনোদনের কুমির ছানা দেখিয়ে যাচ্ছে বাজারের বাবুরা , মালিকরা। এ এক ভয়াবহ পরিস্থিতি।

এখানে শুধু একটা কথা বলবো তা হলো সিনেমা বা ভিডিও ছবি ঘরে বসে হয় না। তার জন্য যেমন স্টুডিও দরকার হয় তেমনি উন্মুক্ত আকাশও প্রয়োজন। ফলে যারা এই সমস্যাকে কাউন্টার করতে ঘরে ঢুকে পড়ছে তারা সম্যক এই মাধ্যমগুলোকে পিছনের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। লকডাউনের সময় তৈরি ঘরে ঘরে ভিডিওর চাষ তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। ঘরে বসে হাত মক্স করা যায় ,আই মিন , প্র্যাকটিস করা যায়। তার বেশি কিছু হয় না।

সু।ঘো – আপনার কি  মনে হয়, মানুষ আবার সিনেমা হলে গিয়ে সিনেমা দেখবে টিকিট কেটে? কোনটা ভাল সিনেমা হলে গিয়ে সিনেমা দেখা, নাকি বিভিন্ন মাধ্যমে বাড়িতে বসেই সিনেমা দেখা?

ল্যাডলী মুখোপাধ্যায় –  Screen is increasingly getting shorter and shorter in size – এটা তো ডিজিটাল যুগের সব চেয়ে বড় সমস্যা। সিনেমা তৈরির কারিগরি ও প্রকরণ গত দুদশকে ক্রমশ পরিবর্তিত হতে হতে আজ পুরোটাই বদলে গেছে। আমাদের চোখের সামনেই ঘটনাগুলো ঘটলো।  পরিবেশনা বা বিপণনের ধাঁচাটাই পাল্টে গেলো।

সিনেমা তৈরি করা যেমন একটি যৌথ কর্মকাণ্ড ঠিক সেইভাবেই সিনেমা দেখার চল ছিল যৌথ ভাবে বসে। সিনেমা দেখতে হলে অন্ধকারে বসতে হয়,চোখ তৈরি করে নিয়ে তবে দেখা শুরু হয়। দ্বিতীয় বিষয় হলো বড় পর্দার বিস্তৃতি। আজকের ছোটো পর্দায় বা মোফোনে দর্শক দেখবে কি করে একটা লঙ প্যানোরামিক শট? কিভাবেই বা সনাক্ত করবে তার মধ্যে থাকা ইমেজগুলোকে? তাহলে কি নতুন সময়ের সিনেমায় কোনো লঙ শট থাকবে না? শুধুই ক্লোজ টু ক্লোজ? তা যাই-ই হোক সে তো আর সিনেমা নয়!!

ফলে আজকের দিনে দাঁড়িয়ে বলতেই হবে যে, সিনেমা আক্রান্ত। শুধুমাত্র ব্যবসার খাতিরে তার বহুমুখী উন্মোচনকে ছেঁটে ফেলা হচ্ছে। ফিল্ম স্ট্রিপ থেকে টেপ হয়ে আমরা এখন চিপের  যুগে ঢুকে পড়েছি। প্রযুক্তি ভালো, তার আরো বিকাশ ঘটুক। কিন্তু তা যেন ক্ষতিকর না হয়ে দাঁড়ায়। শহরের দুচারগাছা মাল্টিপ্লেক্সে কেন বাঁধা থাকবে সিনেমা? কেন এই ব্যবসাব্যবস্থাকে মনোবলের ঘেরাটোপে আবদ্ধ করা হবে? এ সব প্রশ্নের কোনো উত্তর এখনো জানা যায়নি। ফলে করোনা পরবর্তী অবস্থা এই ব্যবস্থাকেই খাল কেটে নিয়ে আসছে। সিনেমায় লগ্নি কমে যাচ্ছে।

লগ্নিকারিরাই প্রযোজক,তারাই পরিবেশক। তারাই ঠিক করছে কি দেখানো হবে আর কি দেখানো যাবে না। এই সব কারনেই দর্শক সিনেমা দেখাকে অগ্রাহ্য করছে। দর্শক কমে আসছে ক্রমশ। ফলে নতুন করে সিনেমা দেখতে চাইলেও তার অবকাশ নেই।

সু।ঘো – বর্তমানে আমাদের দেশ বড় কঠিন এক সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে – বিশেষ করে আমাদের দেশেই সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোর প্রায় ভগ্নদশা – এই বিষয়ে আপনার কী মনে হয়?  

ল্যাডলী মুখোপাধ্যায় –  শুধু সামাজিক বা অর্থনৈতিক নয়। আমরা রাজনৈতিক ভাবেও খুবই কঠিন অবস্থার মধ্যে আছি। মূল্যবোধের চূড়ান্ত এক অবনমন। ব্যক্তি মানুষের অধিকার, কাজের অধিকার, খাদ্যের অধিকার , বাসস্থানের অধিকার, শিক্ষার অধিকার সমস্তই আজ ধরাছোঁয়ার বাইরে।অর্থনীতি ভেঙে পড়েছে। সামাজিক ন্যায়বিচার বলে আর কিছু থাকছে না। তার সঙ্গে রয়েছে রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন। বিশেষ করে স্বাধীনতাকামি ,মুক্তমনা বুদ্ধিজীবীদের ওপর পীড়নমূলক আইনি ফতোয়া জারি করছে দেশ জুড়ে।  রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বললেই তাকে দেশদ্রাহী বলে দাগিয়ে দেওয়া হচ্ছে। দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাস বদলে দেওয়া হচ্ছে। এটা কোনো দেশের অবস্থা হতে পারে না।

এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলছে বিভাজনের রাজনীতি। একে ওর বিরুদ্ধে লাগিয়ে দিয়ে ধর্মীয় সস্তা রাজনৈতিক ফায়দা লোটার চেষ্টা  হচ্ছে। যার থেকে যখন তখন দাঙ্গার পরিস্থিতি তৈরি  হতে পারে। ফলে একটা আমূল পরিবর্তনের আশা করা ছাড়া আর কি বলা যেতে পারে?

সু।ঘো – আপনার সঙ্গে কথা বলে খুব সমৃদ্ধ হলাম ল্যাডলীদা।আর একটা প্রশ্ন দিয়ে এই আলাপচারিতা শেষ করব। আমাদের এতটা সময় দেওয়ার জন্য সত্যিই কৃতজ্ঞ বোধ করছি। এটা আরও বললাম এই কারণে যে, আপনার এখন অবসর সময় নেই বললেই চলে। তবুও ক্ষণিক অবসরে নিজেকে সব কিছু থেকে সরিয়ে কী কী করতে ইচ্ছে করে? কেমন ভাবে অবসর সময় কাটাতে চান? কেমন ইচ্ছে হয়?  

ল্যাডলী মুখোপাধ্যায় – আমি আসলে কখনোই অবসরের কথা ভাবিনি , আজও ভাবি না। পূর্ব নির্দিষ্ট পরিকল্পনা মাফিক  শহর ছেড়েছি তা প্রায় বছর পাঁচেক  হবে। গ্রাম  থেকে দূরে জঙ্গলের মধ্যে একটা খামার বাড়িতে থাকি। একটা ফিল্ম হাব তৈরি করার চেষ্টা করছি। যে কাজগুলো করতে ভালো লাগে তাই করছি। ছবি করছি , ছবি দেখাচ্ছি , দেখছি , লিখছি আর চাষাবাদ করছি মন দিয়ে , লিখছি অনেক আর গান শুনছি। আমি যেখানে থাকি  তাকে “আখড়া” বলে জানে লোকে। সেখানে নিয়মিত নানা শিল্প মাধ্যম ভিত্তিক কর্মশালা হয়। ক্রমাগত চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি যে কিভাবে গ্রামীণ অবস্থায় প্রযুক্তির সহযোগে একটা ভিন্ন অবস্থান তৈরি করা যায়। নতুন প্রজন্মকে আরো বেশি করে কাজে নিযুক্ত করা যায়। সব হয়তো করা যাচ্ছে না। তবে একক উদ্যমে যতটুকু করা যায় আর কি! আমি কোনো এনজিও নই। তাতে কোনো আস্থাও নেই আমার । আমি ও আমার বন্ধুরা কাজ করার চেষ্টা করছি , এইমাত্র। এই আখড়ার দুদিকে দুটি আদিবাসী পল্লী আছে , তাদের সঙ্গে সংযোগ রেখে চলার চেষ্টা করছি।

ফলে অবসরের কথা ভাবছি না। কাজের মধ্যেই অবসর যাপন।

**মুম্বই-স্থিত স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা পপ্যুলেশন ফার্স্ট (Population First) হল একটি ‘সোশ্যাল ইমপ্যাক্ট অর্গানাইজেশন’, যেটি নারীর ক্ষমতায়ন, লিঙ্গ-সাম্য ও কম্যুনিটি মোবিলাইজেশন-এর ক্ষেত্রে কাজ করে।  

সুপর্ণা ঘোষ

আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন লেখক-ফোটোগ্রাফার সুপর্ণা ঘোষ দীর্ঘদিন ধরে বহু নামজাদা ম্যাগাজিনে লিখেছেন। কবিতার জন্য পরপর দু’বার পেয়েছেন ইন্টারন্যাশনাল লাইব্রেরি অফ পোয়েট্রি (আমেরিকা)-র আউটস্ট্যান্ডিং এ্যাচিভমেন্ট পুরস্কার। ইন্টারন্যাশনাল লাইব্রেরি অফ ফোটোগ্রাফি থেকে পেয়েছেন গোল্ড ব্রোচ। NASA-র পেজ-এ তাঁর তোলা ছবি দেখা যায়। স্বীকৃতি পেয়েছেন ইংল্যান্ড-এর রাজপরিবার থেকে, রাণী এলিজাবেথ পাঠিয়েছেন শুভেচ্ছাবার্তা। ফোটোগ্রাফির জন্য সম্মানিত হয়েছেন রাশিয়াতেও। দুর্গাপুরের মেয়ে সুপর্ণার স্কুল-কলেজ-বেড়ে ওঠা ওই শহরেই। বেশ কিছুদিন কাটিয়েছেন কানাডায়। এখন কলকাতার বাসিন্দা।