পার্থ সারথি রায়’এর কলমে
আরম্ভ কথাঃ
আরবি শব্দ নকশাহ থেকে বাংলা নকশা শব্দের উদ্ভব। মানুষের সুকুমার বৃত্তির অগ্রগতির সাথে সাথে কাঠের উপর খোদাই করা বিভিন্ন নকশা তৈরির উন্মেষ ঘটে। গবেষকগণ মোটামুটি একমত যে কাঠে খচিত নকশার নমুনা প্রাচীন ও মধ্যযুগের আসবাবে লক্ষ করা যায়। বাংলার প্রাচীন হিন্দু সংস্কৃতি ও মধ্যযুগের মুসলিম সংস্কৃতির ছিল বাংলার আসবাবের নকশা ও কারুকার্যের প্রধান উৎস।
দারুশিল্পের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে জানা যায় বাংলার দারুশিল্পের বিস্তৃত ভূবণে কোন রকম প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছাড়াই দারুশিল্প নকশাকাররা লোক নকশার কারুকার্য খচিত নয়নাভিরাম আসবাব তৈরি করতেন। তারা স্বাধীনভাবে নিজেস্ব ঐতিহ্য ও অভিজ্ঞতার আলোকে আমাদের গৌরবের প্রতিক লোক নকশাগুলোকে অঙ্কন করতেন। তারপর ক্রেতার চাহিদা অনুযায়ী আসবাবে সাইজ মোতাবেক কাঠের সমতল জমিন তৈরি করে হাতুড়ি, বাটলি, নরুন, হাতকরাত, যদা, কুরানি সহ অতি সামান্য যন্ত্রপাতি দিয়ে নকশা ফুটিয়ে তুলতেন। এ শিল্পকে কেন্দ্র করে বংশ পরম্পরায় উপমহাদেশে বিশাল এক পেশাজীবী জনগোষ্ঠী গড়ে উঠে। এখন কারখানায় নির্মিত কাঠের ব্যবহার্য সামগ্রীর বাজার বৃদ্ধির কারণে দারুশিল্পী ও নকশাকাররা ধীরে ধীরে একটি প্রান্তিক অবস্থানে চলে যেতে বাধ্য হচ্ছে। তাই এখন সময় এসেছে বাংলাদেশের দারুশিল্পের নকশাশিল্পের অঞ্চল ভিত্তিক অথবা জেলা ভিত্তিক ইতিহাস প্রণয়নের। বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীর প্রাক্কালে আমার এই ক্ষুদ্র রচনায় হবিগঞ্জের দারুশিল্পের সাথে জড়িত দারু নকশাকারদের একটি সংক্ষিপ্ত পরিচিতি তুলে ধরার চেষ্টা করছি। আমি বিশ্বাস এবং আশা করি ভবিষ্যতকালে কোন গবেষক এই বিষয়টি নিয়ে আরো ব্যাপক গবেষণা ও একটি পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস গ্রন্থ প্রণয়ন করবেন। হবিগঞ্জের দারুশিল্পের নকশাকারঃ- হবিগঞ্জের দারুশিল্পের সাথে যুক্ত ঘাটিয়া এলাকার প্রবীন দারুশিল্পী জ্যোতির্ময় দাশ ও সতীশ সূত্রধরের সাথে আলাপ করে জানা যায় হবিগঞ্জ গ্রামীণ বাজার থেকে ১৮৭০ সালে দারুশিল্পের সূচিত মহকুমায় দারুশিল্পের নিজেস্ব নকশায় ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পরিসরে কাষ্ট খোদায়ের কাজ করতেন। সে সময় সমগ্র জেলায় প্রসিদ্ধ দারুশিল্পি ও নকশাকার ছিলেন বানিয়াচং থানার ইকরাম গ্রামের কৃষ্ণমোহন সূত্রধর ও আজমিরীগঞ্জ থানার বিরাট গ্রামের কামিনী কুমার সূত্রধর।
২। প্রায় চল্লিশের দশকে হবিগঞ্জ নরসিংহ জিউর মন্দিরের নিকটে একটি কাঠের কারখানা গড়ে উঠে। এটি সম্ভবত জেলার সবচেয়ে পুরাতন কাঠের কারখানা। মালিক ছিলেন জনৈক বৈষ্ণব মাস্টার (বৈষ্ণব চরণ রায়) এই কারখানাকে ঘিরেই হবিগঞ্জে দারুশিল্পের বিকাশ লাভ করে। তখন দারুশিল্প নকশাকারদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন আজমিরীগঞ্জের রাখাল চন্দ্র দেব, রমানাথ সরকার ও তার দুই পুত্র রঞ্জিত সরকার এবং রঞ্জন সরকার। তাদের নিবাস ছিল হবিগঞ্জ শহরের নোয়াহাটি। তারা আসবাবের সাইজ অনুযায়ি সুন্দর নকশা করে দিলে অন্য দারুশিল্পীরা কাঠে নকশা খোদাই করতেন। আরও একজন ছিলেন একই এলাকার যজ্ঞেশ্বর সরকার। সে সময় সুুন্দি, চামল ও গামারি কাঠের উপরই বেশী নকশা করা হত। কিছু বার্মিজ সেগুনেও ফার্নিচার বানানোর প্রচলন ছিল। কালেঙ্গা ও সাতগাও পাহাড় থেকে এসব কাঠ সংগ্রহ করা হত।
বর্তমান সময়ে পাবনার মোঃ লিটন মিয়া, মোঃ আরশাদুল, আশরাফুল, রাজীব জিন্নাহ, রকি, জয়নাল ঈশ্বরদীর খায়রুল সহ অনেকেই ভাল নকশা ও খোদাই করছেন।
কৃষ্ণমোহন সূত্রধর ঃ হবিগঞ্জের দারুশিল্পের ইতিহাসে এক কিংবদন্তিসম নাম কৃষ্ণমোহন সূত্রধর। প্রবীণ দারুশিল্পী যারা আছেন তারা প্রায় সকলেই শ্রদ্ধাভরে কৃষ্ণমোহনের নাম উচ্চারণ করেন। কৃষ্ণমোহন সূত্রধরের বাড়ি বানিয়াচং উপজেলার ইকরাম গ্রামে। পিতা-দোল গোবিন্দ সূত্রধর তার জন্ম আনুমানিক ১৮৫৫ সালে। মৃত্যু আনুমানিক ১৯৪৮। তার তিনপুত্র সর্বমৃত-ক্ষীতিশ সূত্রধর, নরসিংহ সূত্রধর ও কানাই লাল সূত্রধর।
সরেজমিনে অনুসন্ধানের মাধ্যমে জানা যায়, তিনি তার দীর্ঘজীবনে অসংখ্য দারুশিল্পের নকশা সম্পন্ন করেছেন। গ্রামের বিভিন্ন স্থানে উনার নকশা করা জিনিস রয়েছে। এর মধ্যে যেসব নিদর্শন খুঁজে পাওয়া গেছে সেগুলো হচ্ছে ইকরাম গ্রামে হরিমোহন মেম্বারের বাড়িতে কাঠের দুর্গামূর্তি, বি.বাড়িয়া জেলার নাসিরনগর উপজেলার রামপুর গ্রামে নির্মিত একটি সুরম্য কাঠের দরজা, হবিগঞ্জ শহরের ঘাটিয়া এলাকায় বঙ্কবিহারী দাশের বাড়িতে রক্ষিত একটি নকশাখচিত পালঙ্ক, হবিগঞ্জ পৌর এলাকার উমেদনগর আলগাবাড়ির এমদাদ উদ্দিন আহমেদের বাড়িতে একটি সুদৃশ্য পালঙ্ক, বিথঙ্গল আখড়ায় নির্মিত জগন্নাথ দেবের রথ। জানা যায়, নবীগঞ্জ ও হবিগঞ্জের ইসকন মন্দিরের জগন্নাথ দেবের রথও তারই নির্মিত। তবে বর্তমানে উল্লিখিত ৩টি রথেরই সংস্কার করা হয়েছে। ইকরাম গ্রামের কাঠের দুর্গামূর্তির নির্মাণশৈলী অসাধারণ। নিম গাছের গুঁড়ি কেটে কেটে ও খোদাই করে দীর্ঘসময় নিয়ে দৃষ্টিনন্দন মূর্তিটি নির্মাণ করা হয়েছে। নাসিরনগরের রামপুরে প্রাপ্ত সুরম্য দরজাটি নির্মাণ করিয়েছিলেন সুরেন্দ্রমোহন রায় চৌধুরী। দুই পাল্লা বিশিষ্ট দরজার প্রতিটিতে চারটি করে আয়তাকার ঘর রয়েছে। উভয় পাল্লায় মোট আটটি ঘরের কোনটিতে রাধা-কৃষ্ণের যুগল মূর্তি, কোনটিতে গৌর-নিতাই, গনেশ, রাজার হরিণ শিকারের দৃশ্য, বিভিন্ন দেব-দেবী, আল্পনাসহ পশুপাখির দৃশ্য খোদাই করে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। এছাড়াও দরজার চারপাশে চৌকাঠেও খোদাই করা হয়েছে দৃষ্টিনন্দন নকশা। পরবর্তীতে ১৯৭১ সালে বাড়ির মালিক দরজাসহ সম্পূর্ণ বাড়িটি সুরেন্দ্রমোহন রায়ের উত্তরাধিকারীর নিকট থেকে কিনে নেন একই এলাকার ঝাড়– মিয়া। বর্তমানে বাড়িটি ঝাড়– মিয়ার মালিকানাধীন রয়েছে।
হবিগঞ্জ শহরের ঘাটিয়া এলাকায় রক্ষিত খাটটি কৃষ্ণমোহন সূত্রধরকে দিয়ে নির্মাণ করান বঙ্কবিহারী দাশের পিতা রাধাগোবিন্দ দাশ। দৃষ্টিনন্দন এ খাটটি কমপক্ষে তিনজন প্রাপ্তবয়ষ্ক মানুষের শোবার উপযোগী করে তৈরি করা হয়েছে। খাটটির চারদিকে নকশাযুক্ত রেলিং রয়েছে। মশারি টানানোর জন্য চারটি নিপুন নকশাযুক্ত খুঁটি বসানো রয়েছে। খুঁটিকে বেষ্টন করে রয়েছে একটি চৌকো ফ্রেম। আনুমানিক ৫ ফুট উপরে স্থাপিত ফ্রেমের চর্তুপাশের্^ খোদাই করা হয়েছে সুন্দর আল্পনা। এছাড়াও খাটটির মাথার দিকে রয়েছে অনেক আলপনারাজি।
হবিগঞ্জ পৌর এলাকার উমেদনগর আলগাবাড়ির এমদাদ উদ্দিন আহমেদ নানু (৬৮)’র বাড়িতে রক্ষিত খাটটির দারুশিল্পীও কৃষ্ণমোহন সূত্রধর। আনুমানিক ১৯৩০-৪০ সালের দিকে এই পালঙ্কটি নির্মাণ করেছিলেন এমদাদ উদ্দিনের পিতামহ মরহুম মফিজ উদ্দিন আহমেদ। এই খাটটি নকশার দিক থেকে অনেকটাই রাধাগোবিন্দ দাশের নির্মিত খাটের অনুরূপ। তবে উভয় পালঙ্কের মধ্যে রং ও নকশায় কিছুটা পার্থক্য রয়েছে।
কামিনী কুমার সূত্রধর ঃ হবিগঞ্জ জেলার আজমিরীগঞ্জ উপজেলার ১নং ইউনিয়নের মির্জাপুর গ্রামে জন্ম নেয়া কামিনী কুমার সূত্রধর ছিলেন একজন স্বশিক্ষিত ও সৃজনশীল দারুশিল্পী। তাঁর জন্ম আনুমানিক ১৯১৭ সালে মৃত্যু-২০০৪ সালে উল্লেখিত গ্রামে। পিতার নাম কৈলাশ সূত্রধর ও মাতার নাম বিলাস মনি। স্ত্রী মনোমোহিনী সূত্রধর। কামিনী কুমার সূত্রধরের পরিবারবর্গের সাথে আলাপ করে জানা যায়, তিনি অল্প বয়স থেকেই নিজ চেষ্টায় কাজ শিখেছেন। প্রায় ১৭ বছর বয়সে তিনি নিজ হাতে একটি কাঠের বিশ^কর্মা মূর্তি তৈরি করেন। উক্ত মূর্তিটিকে বাড়িতে পূজা-অর্চনা করে তিনি প্রথম কর্মজীবনের সূচনা করেন। উল্লিখিত মূর্তিটি এখনো তার বাড়িতে দেবতার সিংহাসনে রক্ষিত আছে। তার শিক্ষাজীবন সম্পর্কে জানা যায়, গ্রামের স্থানীয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শুরুতে পড়াশোনা করেন কামিনী কুমার সূত্রধর। পরবর্তীতে বিরাট হাইস্কুলে প্রথম ব্যাচের ছাত্র হিসেবে ভর্তি হন। নবম শ্রেণীতে অধ্যয়নকালে পিতার মৃত্যুতে পড়াশোনায় ছেদ ঘটে। তরুণ বয়স থেকেই দারুশিল্পী হিসেবে এলাকায় তার সুনাম ছড়িয়ে পড়ে। কর্মজীবনের একপর্যায়ে দিরাই ভাটিপাড়ার জমিদার পুতুল বাবুর বাড়িতে দীর্ঘ ১৪ বছর কাজ করেছেন। এছাড়া আজমিরীগঞ্জের নুরু মিয়া (মোঃ আব্দুন নূর) চেয়ারম্যানের বাড়িতেও কাজ করেছেন অনেক বছর। ওই বাড়িতে তার তৈরি একটি সুদৃশ্য খাট এখনো মোঃ আব্দুন নূর মিয়ার ছেলে মোঃ মাসুক মিয়া(৫৫) নিকট রক্ষিত আছে। কামিনী কুমারের সৃষ্টিকর্মের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে বানিয়াচংয়ের কালিবাড়ীতে কাঠের মূর্তি, হবিগঞ্জের মিরপুর শচীধামে শচীমাতার মূর্তি, আজমিরীগঞ্জ মধ্যবাজারে গোবিন্দ জিউর মন্দিরের মূর্তি, গার্নিংপার্ক এলাকার নগেন্দ্র ভবনে সাপ ময়ূরের কাঠের কারুকার্য, হরিণের মাথা, রামকৃষ্ণ মিশনে কাঠের ঈগলের মুখে সাপ ইত্যাদি।
কামিনী কুমার সূত্রধরের ৩ পুত্র। প্রথম পুত্র মৃত কানাইলাল সূত্রধর, ২য় পুত্র মৃত কালি কুমার সূত্রধর ও ৩য় পুত্র মাখনলাল সূত্রধর। ১ম পুত্র কানাইলাল সূত্রধর স্বাধীনতার পূর্ব থেকেই ভারতের ত্রিপুরার শাবরুম মনু বাজারে সপরিবারে বসবাস করেছেন। তার এক পুত্র ও দুই কন্যা রয়েছে। ২য় পুত্র কালি কুমার সূত্রধরের দুই পুত্র ও তিন কন্যা। আর ৩য় পুত্র মাখন লাল ১৯৯৬ সালে বিরাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা পেশা থেকে অবসর গ্রহণ করেন। তার দুই পুত্র এক কন্যা রয়েছে। পুরো বিরাট গ্রাম ঘুরে দেখা যায়, এখানে দু’টি পাড়া মিলিয়ে প্রায় ৬০টি পরিবার কাঠের আসবাবপত্র তৈরি পেশার সঙ্গে যুক্ত।
মোঃ লিটন মিয়া ঃ সাম্প্রতিককালে হবিগঞ্জে যারা দারুশিল্পকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন তাদের মধ্যে সবচেয়ে গুণী ও সফল দারুশিল্পী হচ্ছেন মোঃ লিটন মিয়া। তার পৈতৃক বাড়ি পাবনা জেলার ঈশ^রদী থানার শাহপুর গ্রামে। তিনি তার এলাকার এক বন্ধু বাবুলের মাধ্যমে ২০০২ সালে হবিগঞ্জে আসেন। বর্তমানে হবিগঞ্জ শহরের শ্মশানঘাট রোডে একটি কারখানা স্থাপন করেছেন তিনি। তার উস্তাদ ছিলেন পাবনার আব্দুল মতিন কারিগর। হবিগঞ্জে আসার পর লিটন মন্দরি ইউনিয়নের শেখ শামছুল হক চেয়ারম্যানের বাড়িতে প্রথম কাজ শুরু করেন। সেখানে কারুকার্যখচিত কিছু খাট, দরজা ও বিভিন্ন আসবাবপত্র নকশা করেন। এরপর থেকেই দারুশিল্পী হিসেবে হবিগঞ্জের সর্বত্র তার সুনাম ছড়িয়ে পড়ে। পরে তিনি কারখানা স্থাপন করেন। তিনি তার ভাতিজা ও শিষ্য আরশাদুলকে হবিগঞ্জে নিয়ে এসেছেন। বর্তমানে আরশাদুল, জিন্নাহ, লেদু, জয়নাল সহ অনেকেই হবিগঞ্জে ভাল কাজ করছেন (১৬)। লিটন জানান, তিনি লোকজ মোটিফে দারুশিল্প সৃষ্টি করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। এছাড়াও তার শিষ্যদের মধ্যে ভাল কাজ করছেন ঈশ^রদীর খায়রুল ইসলাম। লিটনের পিতার নাম মোঃ মনসুর আলী প্রামাণিক, মাতা রহিমা বেগম। জন্ম ১৯৭০ সালে। দারুশিল্পী লিটন মিয়া ও খায়রুল ইসলামের হাতে তৈরি লোকমোটিভের একটি ‘পদ্ম পালঙ্ক’ হবিগঞ্জ শহরের ব্যবসায়ী স্বর্গীয় দিলীপ কুমার রায়ের বড় ছেলে মেটলাইফের এজেন্সি ম্যানেজার বাদল রায়ের বাসায় রক্ষিত আছে। পালঙ্কটি তৈরিতে এর প্রধান কারিগরসহ ২/৩ জন সহকারী প্রতিদিন একটু একটু করে কাজ করছেন। এর মাথার ও পায়ের দিকের দেয়ালসহ চারপাশে কাঠ খোদাই করে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে অনাহত চক্র, ফুটন্ত পদ্ম, পরশ পাথর, জোড়া তোতা, মকরের মুখ ও বিভিন্ন লোকজ আল্পনা। এর প্রধান কারিগর মোঃ লিটন মিয়া জানান, ক্রেতার সাথে পরামর্শ করে তিনি পদ্ম পালঙ্কের নকশাটি সম্পন্ন করেছেন। পদ্ম-পালঙ্কটি তার নিজস্ব সৃষ্টি। এর আগে কোথাও এমন পদ্ম পালঙ্ক নির্মিত হয়নি। দেখা যায় পদ্ম-পালঙ্কটির শিয়রের জমিনের মাঝখানটিতে কাঠখোদাই করে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে একটি দৃষ্টিনন্দন পদ্ম ফুল। এর উপরে রয়েছে দুটি মকরের ঠোঁটের মাঝখানে একটি পদ্মকুঁড়ি। আর এর চারপাশে বিকরিত হচ্ছে সূর্য কিরণ। এর দুপাশে খোদিত আছে দুটি সুদৃশ্য খীলান। খাঠটির খুটিগুলোর মাথায় চৌকো স্থানে খোদিত আছে অনাহত চক্র। মাঝখানে পরশ পাথরের চিহ্ন। খাটটির দুই পাশে রয়েছে জোড়াতোতা এছাড়াও পদ্ম-পালঙ্কের প্রায় সারাগায়েই নানা ধরনের নকশা ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। প্রতিটি নকশার বিভিন্ন পৌরাণিক ও প্রতীকী অর্থ রয়েছে।
অনাহত চক্র হচ্ছে মানবদেহের সাতটি পদ্মচক্রের কেন্দ্রীয় চক্র। এর অবস্থান বুকের মধ্যখানে। শাস্ত্রে আছে, অনাহত চক্র মানবমনের কোমলতা, হৃদয়বৃত্তি, সুকুমারবৃত্তি ও সৃজনশীলতাকে নিয়ন্ত্রণ করে। অনাহত চক্রের সাধনাই মানুষকে হৃদয়বান মানুষ হিসেবে গড়ে তোলে। একে কল্পনা করা হয়েছে বারো পাপড়িবিশিষ্ট একটি পদ্মরূপে। আর ফুটন্ত পদ্মফুল হচ্ছে সৌন্দর্য্য ও নিষ্কলুষতার প্রতীক। পদ্মের জন্ম জলে ও কাঁদায়, কিন্তু সে সমস্ত আবর্জনা ও কলুষতা হতে নিজকে বাঁচিয়ে সৌন্দর্য ও পবিত্রতার নমুনা হিসেবে নিজেকে তুলে ধরে।
পরশ পাথর এমন এক বস্তু, যার স্পর্শে সবকিছু স্বর্ণে পরিণত হয়। এর দ্বারা বোঝানো হয়, জ্ঞান, নৈতিকতা আর সৌন্দর্যবোধই মানবজীবনের পরশ পাথর। এসবের চর্চায় ও সংস্পর্শে মানুষ সোনার মানুষ তথা প্রকৃত মানুষে পরিণত হয়।
জোড়া তোতা একটি লোকজ মোটিক। লোক কাহিনিতে তোতা পাখিকে দেখানো হয়েছে শুভ, অশুভের ভবিষ্যদ্বক্তা হিসেবে। আর জোড়া তোতাকে বর্ণনা করা হয়েছে প্রেম ও মিলনের প্রতীক হিসেবে। তাই যুগ যুগ ধরে বাংলার নারীদের রুমাল ও বালিশের ওয়াড়ের সূচিকর্মে এবং আয়নার উপরের দিকে জোড়া তোতা অঙ্কিত হয়েছে।
মকর একটি পৌরাণিক প্রাণী। দেখতে অনেকটা শুশুকের মতো, পৌরাণিক কাহিনি অনুসারে মকর গঙ্গার বাহন। এছাড়া মাঘ মাসের সংক্রান্তিকে ও মকর সংক্রান্তি বলা হয়। এ দিন থেকেই সূর্য মকরক্রান্তিতে ভ্রমণ বা উত্তরায়ণে গমন শুরু করে। এছাড়াও পদ্ম পালঙ্কটিতে বিভিন্ন আল্পনা, ফুল-লতা পাতাসহ অনেক লোকজ অনুষঙ্গ ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
মোঃ আরশাদুলঃ দারুশিল্পকে বর্তমানে হবিগঞ্জে যারা এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন তাদের মধ্যে সফল দারুশিল্প নকশাকার আরশাদুল ইসলাম। তিনি তার পৈতৃক বাড়ি পাবনা জেলার ঈশ্বরদী থানার শাহপুর গ্রামের দারুশিল্পী মোঃ লিটন মিয়ার মাধ্যমে প্রথম হবিগঞ্জে আসেন। ২০০৩ সালে হবিগঞ্জে আসার পর উস্তাদ মোঃ লিটন মিয়ার সাথে কাজ শুরু করেন। হবিগঞ্জে মন্দরি ইউনিয়নের শেখ শামছুল হক চেয়ারম্যানের বাসায় কার্যখচিত আসবাব তৈরির মধ্য দিয়েই হবিগঞ্জে তার পরিচিতি। বর্তমানে তিনি হবিগঞ্জ শহরের বাইপাস রোড এলাকায় নিজে একটি কারখানা স্থাপন করেছেন। আরশাদুল নাটোর দয়ারাম পুরের বাবু মিক্রির নকশা ও কাজ দেখে প্রথমে এই কাজে উৎসাহিত হন। বাবু মিক্রির শিষ্য হিসাবে তিনি অনেকদিন দারুশিল্পের নকশার অভিজ্ঞতা নেন। গুরশিষ্য পরম্পরায় দারুশিল্পকে এগিয়ে নিতে তিনি নিরলস ভাবে কাজ করছেন বতমানে তার নকশা করা অনেক কাজ হবিগঞ্জ শহর ও আশপাশের এলাকায় ছড়িয়ে রয়েছে। তিনি দরজা, জানালা, আসবাবপত্র নকশা করতে স্বাচ্ছন্দ বোধ করেন। লোক মোটিভে কারুকার্যখচিত দৃষ্টিনন্দন নকশার জন্য তার সুনাম হবিগঞ্জের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। নকশা ও খোদাই এক একা করা সম্ভব না হওয়ার কারণে তিনি রকি, আশরাফুল, আশিক, অনিক ও কার্তিককে হবিগঞ্জে নিয়ে আসেন। বর্তমানে রকি, আশিক, আশরাফুল সহ অনেকেই নকশা ও খোদাইয়ের ভাল কাজ করছেন।
আশরাদুল জানান তিনি বাংলার লোকজ আল্পনা নির্ভর নকশা করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। প্রতিটি নকশা তার ভালবাসা ও কষ্টের সৃষ্টি। আরশাদুলের পিতার নাম আবদুল গাফফার সরদার মাতা ছালেহা বেগম জন্ম ১৯৮০ সালে। দারুশিল্প নকশাকার আরশাদুল সম্প্রতি তার শিষ্য রকি ও আশিককে নিয়ে ৫/৬ মাসে একটি নকশী পালঙ্ক তৈরি করেছেন। লোকজ আল্পনা নির্ভর পালঙ্কটিতে মধ্য রিলিফ ধারা লক্ষ্য করা যায়। নকশী পালঙ্কটি দেখতে নগর বাসী অনেকেই তার কারখানায় যাচ্ছেন। দীর্ঘ সময়ে নিমীয়মান নকশা পালঙ্কটি শহরের অনেকেরই দৃষ্টি ও মনোযোগ আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছে। উল্লেখিত নকশী পালঙ্ক নির্মাণে প্রায় একলক্ষ টাকা খরচ হবে বলে জানা যায়। পালঙ্কটিতে শিয়রের পাশে, পায়ের দিকে, পাশের উভয় দিকে ও পায়াগুলোতে কাঠ খোদাই করে সুন্দর নকশা সমূহ সৃজন করা হয়েছে। বাংলার ঐতিহ্যবাহী শিল্পরীতি অনুসারে পালঙ্কের শিল্প দর্শন রচিত হয়েছে।
পার্থ সারথি রায়, হবিগঞ্জ।









