সুমন হাইত’এর কলমে
আর্ট ডিরেকশন : প্রসেনজিৎ বেরা
শুধু আসা-যাওয়া?
হাঁফিয়ে যাচ্ছি মশাই। হাঁফিয়ে যাচ্ছি। আর পারা যাচ্ছে না। কেবলই মনে হচ্ছে করোনা নামক এক আতঙ্ক শরীর মন জুড়ে চেপে বসে আছে। এমনই আষ্টেপিষ্টে জড়ানো শ্বাসরোধী তার বাঁধন যে, তার নাগপাশ থেকে মুক্তি পাওয়া বোধহয় আমার বা আমাদের পক্ষে এজন্মে আর কোনোমতে সম্ভবপর নয়।
যা কিছু করতে যাই, হাজারো বিধিনিষেধের প্রোটোকল এসে হাজির। তার প্রভাব মনের উপরেও পড়তে বাধ্য। এবং তা পড়ছেও। ভাবনারাও স্থবির। চাচা আপন প্রাণ বাঁচা তত্ত্বে বিশ্বাসী আমরা কেবলই ভ্যাকসিন নামক বিশল্যকরণীর সন্ধানে মরীচিকার মতো ধেয়ে চলেছি নিরলসভাবে। শরীরের সাথে তালে তাল মিলিয়ে মনের অবস্থাও ক্রমশ সঙ্গীন।
এভাবে কি বাঁচা যায়, বলুন? কদ্দিন আর এইভাবে মরে মরে বাঁচবো? তাই খানিকটা বেপরোয়া তথা মরিয়া হয়েই ছুটলাম মুক্ত প্রকৃতির কাছে– শরীরের সাথে মনেরও অক্সিজেন জোগান অব্যাহত রাখতে। পাড়ি দিলাম বাংলা- ঝাড়খন্ড সীমানার এক্কেবারে লাগোয়া এক প্রান্তিক গ্রাম– কাঁকড়াঝোরে।

নামকরণের সার্থকতা
নামটা বেশ চমকপ্রদ না! আমি তো নাম শুনেই উৎসের খোঁজে ঢু দিলাম। দেখি, গ্রামের এই অদ্ভুতসুন্দর নামকরণের পিছনে দুই তত্ত্ব হাজির।
প্রথম মতানুযায়ী, কাঁকড়াঝোর শব্দের অর্থ পাহাড় ও ঝর্ণার মিশেল। কারণ স্থানীয় ভাষায় কাঁকড়ার অর্থ পাহাড় এবং ঝোর বা ঝোড় হল জঙ্গল। অপর মতে, এই গ্রামকে পরিবেষ্টন করে আছে যে সকল অনুচ্চ পাহাড়, তাদের গা বেয়ে নেমে আসা ঝোর বা ঝর্ণায় বর্ষায় প্রচুর কাঁকড়া পাওয়া যেত। তাই গ্রামের নাম কাঁকড়াঝোর (ঝোর=ঝর্না)।
প্রথম তত্ত্বের দিকে সংখ্যাগরিষ্ঠের সায় থাকলেও দ্বিতীয় মতকেও একেবারে খারিজ করে দেওয়া চলে না। নামকরণের উৎস নিয়ে দ্বিমত থাকলেও এখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, অনাবিল প্রাণপ্রাচুর্য, অফুরান বৃক্ষ সারির নয়নামাভিরাম দৃশ্য যে আপনাকে মুগ্ধ করবেই এ নিয়ে মতভেদের কোনো জায়গা নেই।
আমাদের যাত্রা হল শুরু
নির্দিষ্ট দিনে সাতসকালে আটজন ভ্রমণ রসিক মিলে আহ্লাদে আটখানা হয়ে দিলাম প্রকৃতি সাগরে ডুব। আর নাইতে যখন হবেই তখন কাকস্নান করে লাভ কোথায়? অবগাহন ব্যতীত দ্বিতীয় কোনো রাস্তায় হাঁটবোই না। অতএব,দিন দুয়েকের নিখাদ ভ্রমণ সফর।
বর্ষার জঙ্গল যে কি অনুপম দ্রষ্টব্য তা চাক্ষুষ না করলে বোঝা দায়! গ্রীষ্মের দাবদাহ থেকে রেহাই পেয়ে বৃষ্টিস্নাত হয়ে গাছেদের আনন্দ আর ধরে না। নিজেকে যতটা সম্ভব সুন্দর, সুসজ্জিত, সুদর্শন করে তুলতে বিন্দুমাত্র কসুর করে না। নবযৌবন ফিরে পেয়ে নিজেকে উজাড় করে দেয় সে। জঙ্গলের যে দিকে তাকানো যায়, কেবলই নিবিড় সবুজের সমারোহ।
বেলপাহাড়ী থেকে কাঁকড়াঝোর যাওয়ার ২৫- ৩০ কিমি পথের সৌন্দর্য লেখনীতে উপস্থাপিত করার মতো এলেম আমার নেই। এমন অপার্থিব চোখজুড়ানো প্রাকৃতিক শোভা বর্ণনা করার মতো শব্দ ভান্ডার আমার তুণীরে কস্মিনকালেও ছিল না। তবে লিখতে না পারলেও মনের মণিকোঠায় সে শোভার সুখস্মৃতি নিশ্চিন্তে, সুরক্ষিতভাবে সঞ্চিত আছে। আর তা থাকবেও আজীবন।
অরণ্যের বুক চিরে যাওয়া ঝাঁ চকচকে পিচের রাস্তার উভয় দিকে শাল, সেগুন, মহুয়া, পিয়াশাল, আকাশমণি, ইউক্যালিপটাস, বহেড়া, কেন্দু ও আরও কতশত নাম না জানা গাছের সমারোহ। ক্ষেত্রবিশেষে কাজু গাছেরও দর্শন মেলে। গমন পথের বেশির ভাগটাই চড়াই- উৎরাইয়ে ভরা। গাড়ি একবার খাড়াই পথে তরতরিয়ে উপরে ওঠে তো পর মুহূর্তেই মসৃণ ঢালু রাস্তায় গড়গড়িয়ে নেমে চলে।
উত্তেজনার বশবর্তী হয়ে দু-একবার গাড়ি থামিয়ে জঙ্গলের অন্দরে নজর দিতেই মাথার উপরের আসমানী শামিয়ানা অজান্তে রংবদলে সবুজ হয়ে যায়। সবুজের পুরু পরত ভেদ করে সূর্যের আলো জঙ্গলের নীচটুকু পর্যন্ত নামার সুযোগ পায় না। একের পর এক রাশি রাশি সারি সারি বৃক্ষ দন্ডায়মান। এ যেন নিজেকে জাহির করার তীব্র প্রয়াস। একে অপরকে ছাপিয়ে যাওয়ার নিরন্তর প্রচেষ্টা। ফলস্বরূপ গাছের প্রস্থ যত না প্রসারিত হয়, তার থেকে কয়েকগুণ দীর্ঘায়িত হয় তার উচ্চতা।
ঘন অরণ্যের মাঝে নিজেকে হারিয়ে নিয়ে যেতে বিশেষ সময় লাগে না। কেবল জঙ্গলের মাঝে নিজেকে সম্পূর্ণ ভাবে সঁপে দিলেই হল! তারপরের কাজটুকু প্রকৃতিই সেরে ফেলে চুপিসারে। পরম আদরে সে তোমায় নিজের কাছে টেনে নেয়।
আঃ, এমন বিশুদ্ধ অক্সিজেন যে শেষ কবে ফুসফুস ধারণ করেছে তার ইয়ত্তা নেই। শহুরে ক্লান্তি নিমেষে উধাও। মেজাজ ফুরফুরে। দিল খুশ। সাথে পাখির কুজন তো আছেই। মন তো দু’কলি গেয়েই নিল গুনগুনিয়ে, ‘আহা কি আনন্দ আকাশে বাতাসে, শাখে শাখে শাখে পাখি ডাকে, কত শোভা চারিপাশে।’
জুতসই ক্যামেরা ও জাঁদরেল ক্যামেরাম্যানের যুগলবন্দী এই পাহাড়- জঙ্গলের দৃশ্যকে বিশ্বের যে কোন প্রাকৃতিক শোভাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলতে পারে।
নিরন্তর মজার মাঝেও আতঙ্ক যে নেই তা অবশ্য জোর দিয়ে বলা যায় না। যত্রতত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে পরে থাকা হাতির মল দেখে দিব্যি উপলব্ধ হয় যে এই জঙ্গল তাদের অবাধ বিচরণক্ষেত্র। এ পথে দলমার দামালদের নিত্য আনাগোনা। আর বিশেষ করে ঈষৎ সমতলে ফসল পাকার সময় তো কোনো কথাই নেই! হস্তি দর্শন যে নিশ্চিত তার জন্য হলফনামা দেওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। শুধু কি তাই! এই নিবিড় ঘন অরণ্য ভালুক, বুনো শুয়োর, হায়না, হরিণ সহ বিভিন্ন চতুষ্পদীর বাসভূমি। তাই জঙ্গলের অন্দরে খানিক উঁকিঝুঁকি মেরে আবার গাড়িতে বসলাম।
একের পর এক ভুলাভেদা, শিয়ারবিন্দ, চাকাডোবা, জমিরডিহা, ময়ূরঝর্ণা অতিক্রম করে অবশেষে বেলা ১২ টা নাগাদ পৌছালাম কাঙ্খিত গন্তব্যে অর্থাৎ কাঁকড়াঝোর।
হোটেল আগে থেকে বুকিং করা ছিল না। যদিও জানতাম মেরেকেটে ৩-৪ টের বেশি হোটেল বা হোম স্টে ছাড়া এখানে রাত্রিবাসের অবকাশ নেই। তবুও বরাতজোরে মাথা গোঁজার ঠাঁই পেয়ে গেলাম। মাহাতো হোম স্টে …

ভূত কি বিড়ি খায়?
ও হ্যাঁ, তার আগে কাঁকড়াঝোরের ইতিহাস খানিক না জানালেই নয়।
আচ্ছা, চিন্ময় রায়ের সেই বিখ্যাত চারমূর্তি সিনেমার স্মৃতি নিশ্চয়ই এখনও সতেজ। হাওয়া বদলের উদ্দেশ্যে পটলডাঙার টেনিদা, প্যালারাম, হাবুল ও ক্যাবলা যে ঝন্টি পাহাড়ে ঢু মেরেছিল সেটি আদতে বাস্তবের কাঁকড়াঝোর। বিখ্যাত এই বাংলা কমেডির বেশিরভাগ আউটডোর শুটিং হয় এই পাহাড়-জঙ্গলে।
আর সেই সাথে ঢ্যাঙা, কৃষ্ণকায়, পেটাই চেহারার ঝন্টুরামকে মনে আছে তো? হ্যাঁ, হ্যাঁ, যাকে প্রথম দর্শনেই ভূত ভেবে ভয় পেয়ে ভিরমি খেয়েছিল টেনি মুখুজ্জে। সেই ঝন্টু রামের চরিত্রে অভিনয়কারী গোপীনাথ মাহাতোর বাড়িতেই হল আমাদের নিশিযাপন।
গোপীনাথবাবু পরলোক গমন করার পর ওনার বসতবাড়িটি হোম স্টে হিসাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ওনার ভাইপো আছেন তদারকির দায়িত্বে। থাকা, খাওয়ার চমৎকার বন্দোবস্ত। সাবেকি আমলের মাটির দোতলা বাড়ির কাঠামো অটুট রেখে যতটুকু আধুনিক সুযোগ সুবিধার আয়োজন সম্ভব ততটুকুই এ বাড়ি তথা হোম স্টেতে মজুত। বাড়ির দেওয়াল এলাকার সমস্ত বাড়ির সঙ্গে সাযুজ্য রেখে রঙিন ভাবে সুচিত্রিত। ঘরের মধ্যেও দেওয়ালে রঙিন নকশা ও আলপনার কাজ। বাড়ির নীচের তলা ভাড়া দেওয়া হয় না। দোতলার চারটি কামরাই ভ্রমণ রসিকদের জন্য উন্মুক্ত। ঘরের মেঝেতে বিছানার আয়োজন। পুরু তোষকের ওপর বিছানার চাদর পাতা। ঘরের সঙ্গেই সংলগ্ন বাথরুম। সব মিলিয়ে অতি চমৎকার বন্দোবস্ত। আমাদের ঘরের জানালা দিয়ে সামনের পাহাড়ের দৃশ্য উন্মুক্ত। ঘর দেখেই থাকার বাসনা জাগে। সঙ্গে মানানসই খাবার। মনে করিয়ে দেওয়া ভালো যে, এই পরিবেশে কিন্তু ক্ষিদে বেশ দ্রুত তার উপস্থিতি জানান দেয়। পেট কেবলই খাই খাই করে। এমন চমৎকার পরিবেশে সুস্বাদু ভোজনের পর প্রাণ, মন চাঙ্গা হতে বাধ্য। তাইতো লিখতে বসেও স্মৃতিচারণের ঢেকুরে মন ভালো হয়ে যায়।
হোটেলে ঢুকে খানিক জলখাবার সেরে স্নানের পালা। হোটেলেই করা যেত দিব্যি। কিন্তু সফরসঙ্গীরা কেউই উন্মুক্ত প্রাকৃতিক পরিবেশে স্নানের অপূর্ব সুযোগ হাতছাড়া করতে চায় না। তাই ঝাড়গ্রাম তথা বাংলার সীমানা অতিক্রম করে ঝাড়খন্ডে চললাম জলকেলি করতে।
কাঁকড়াঝোর ড্যাম
নামেই ঝাড়খন্ড। পড়শি রাজ্য। গুগল ম্যাপের দর্শন ব্যতীত অনুধাবন করা কার্যত অসম্ভব। প্রকৃতি কি আর দেশ, সীমানার গন্ডি মানে? সে চলে তার আপন ছন্দে। মানুষের হস্তক্ষেপ দুই রাজ্যের সীমারেখা টানলেও প্রকৃতির কিস্যু যায় আসে না। তার গতি দুর্বার; তার ছন্দ অটুট; তার সৌন্দর্য আদি, অকৃত্রিম থাকে।
নিকটবর্তী কাঁকড়াঝোর ড্যামের নীচের জলে স্নানের এমন সুযোগ পেয়ে সকলেই যারপরনাই আপ্লুত। জলের বেগ ও বড় পাথরের চাই দেখে আমি প্রথম দিকে খানিক ঘাবড়ালেও সাথে সাতসঙ্গী থাকায় মনোবল খুব বেশি চিড় ধরেনি। বরং সকলের সাথে তালে তাল মিলিয়ে অবগাহনের এমন সুবর্ণ সুযোগ হাতছাড়া করলে আমার আপসোসের সীমা থাকতো না। বর্ষায় জলের তোড় বেশ তীব্র। পাহাড়ের লাল পাথরের গা বেয়ে নামার ফলে জলের রঙ ঈষৎ লালাভ। রঙ রাঙা হলেও জল কিন্তু স্বচ্ছ। স্নানের পক্ষে চলনসই। সেই জলে আট যুবকের দাপাদাপি বহুদিন স্মৃতিতে অমলিন থাকবে এবং সুখস্মৃতির তালিকায় বেশ উপর দিকেই তা থাকবে।

পিঁপড়ের চাটনি
স্নানপর্ব মিটতেই পেটে ছুঁচোর কেত্তন শুরু । ডনবৈঠক দিয়ে নিজেদের হাজিরা জানাতে দ্বিধাবোধ করে না। ক্রমশ দাপাদাপি বাড়ে। তাই হোটেলে ফিরে গোগ্রাসে খাওয়ার পালা। আহারে কোনরূপ আতিশয্য নেই। নিপাট সহজপাচ্য খাবার। স্বাদ চমৎকার। অন্যদিনের তুলনায় খানিক বেশি ভাত খেলাম বেশ তৃপ্তি করেই।
তবে খুব ইচ্ছা ছিল পিঁপড়ের চাটনি খাবার। শুনে রাঁধুনি জানালো, এখন বর্ষায় পিঁপড়ের ডিম পাড়ার পালা। সেই ডিমেরও চাটনি হয়। তবে তার স্বাদ আমাদের মত শহুরে জীবের জিভে রসনা তৃপ্তি দেবে না। তাই শীতকালীন দ্বিপ্রাহরিক আহারের মতো শেষ পাতে পিঁপড়ে বাটার সুস্বাদু চাটনির স্বাদ না পাওয়ায় মনের মধ্যে কিঞ্চিত আক্ষেপ থেকেই গেল।
কেটকি লেক
আহার পর্ব শেষে আবার ঘোরাঘুরির পালা। স্থানীয় দ্রষ্টব্য বা লোক্যাল সাইটসিইং দেখার উদ্দেশ্যে গাড়িতে চড়ে বেশ কিছুটা দূরত্বে গিয়ে যেখানে পৌছালাম তার নাম কেটকি লেক। প্রাকৃতিক এই হ্রদের চারপাশে যেসকল অনুচ্চ ছোটখাটো পাহাড় রয়েছে তারই জল ঝর্ণার আকারে নেমে জমা হয় হ্রদের অন্দরে। ওইভাবেই স্বাভাবিকভাবেই বর্ষাতেই লেকের জলের গভীরতা থাকে সর্বাধিক। বেশ অনেকখানি জায়গা জুড়ে তৈরি এই লেক। টলটলে জলের ওপর পাহাড়ের জল ছবির দৃশ্য এই হ্রদকে আরো নয়নাভিরাম ও মনোমুগ্ধকর করে তুলেছে। পাহাড়ি পরিবেশে জলের সংকটমোচনে এই হ্রদ বনের পশু-পাখিদের পিপাসা মেটানোয় দারুণ কার্যকর। বিশেষত গরমের সময়ে এই হ্রদের তাৎপর্য কয়েকগুণ বেড়ে যায়। লেকের পাড়ের চাষজমি ও লেকের পাড়ে বসে স্থানীয় মানুষদের ছিপ ফেলার দৃশ্য বুঝিয়ে দেয় কেবল বন্য জীবজন্তুই নয়, এই হ্রদ তাদের কাছেও আশীর্বাদ স্বরূপ। লেকের পাড়ে কিছুক্ষণ শরীর এলিয়ে আড্ডা দেওয়ার পর চললাম পরের দ্রষ্টব্য।

ঢাঙ্গীকুসুম গ্রাম-ডুঙরি জলপ্রপাত
এবারের গন্তব্য ঢাঙ্গীকুসুম গ্রাম। এখানকার সব স্থানের নামকরণেই বৈচিত্র বিদ্যমান। শুনতে বেশ লাগে। তিন খুদে গাইডের তৎপরতায় গ্রাম থেকে খানিক উত্তরায় হেঁটে পৌছালাম এক অনিন্দ্যসুন্দর পাহাড়ি ঝর্ণার কাছে। কি অনুপম তার রূপ! প্রাণবন্ত, প্রাণোচ্ছল। শীতকালে যে শীর্ণকায় বার্ধক্যের রূপ দেখা যায় তা বর্ষার জলে পরিপূর্ণ বিকশিত হয় নব যৌবনে রূপ ধারণ করেছে।
পাহাড় বেয়ে তীব্র বেগে নেমে আসা রক্তিম জলরাশি দেখে চোখ সার্থক। ঝরনার পোশাকি নাম ডুংরি আর সেই ঝরনার জল যে নদীকে পুষ্ট করেছে তার নামও ডুংরি। নামটায় বেশ পাহাড় পাহাড় ভাব বর্তমান, তাই না!
উত্তরের বড় বড় পাহাড়ি এলাকা বাদ দিলে পশ্চিমবঙ্গ ও তৎসংলগ্ন এলাকায় যেসকল জলপ্রপাত বর্তমান তার প্রকৃত রূপ পরিদর্শন করতে গেলে বর্ষাকালই শ্রেয়। কারণ এখানকার পাহাড় থেকে সৃষ্ট নদীগুলি বরফ জলে পুষ্ট। তাই শীত বা বছরের অন্য সময়ে ঝরনাগুলির যে রূপ পরিলক্ষিত হয় তার সাথে বর্ষার রূপের আকাশ-পাতাল প্রভেদ। ঝরনার চপলতা, প্রাণচঞ্চলতা দেখতে বর্ষাকালের বিকল্প নেই।
খুদে, অভিজ্ঞ গাইডদের সাথে আলাপচারিতা সাথে সাথে কখন যে আসা যাওয়ার পথ পার হয়ে যায় মালুম হয় না।
সিঙ্গাডোবার গ্রামীণ হাট
ডুংরি ফলস দর্শন সেরে গাইডদের পারিশ্রমিক মিটিয়ে ফিরতি পথে সিঙ্গাডোবায় এক অদ্ভুত দৃশ্যের সাক্ষী হলাম। সাপ্তাহিক গ্রামীণ হাট।
জঙ্গলমহলের অন্দরে আদিবাসী এলাকায় এমন হাট দেখার সাধ দীর্ঘদিন মনের মধ্যে জমা ছিল। এবারের সফরে তাও পূর্ণ হল।
বৈকালিক এই হাটে নিত্যপ্রয়োজনীয় সমস্ত জিনিসের জোগান মজুত। সবজি, মুদি, মাছ-মাংস, পোশাক, গৃহস্থালির জিনিসপত্র এমনকি অস্থায়ী কামারশালা পর্যন্ত বর্তমান। সতেজ সবজি অথচ দাম ন্যূনতম। লোকসমাগম যথেষ্ট।
হাটে হাঁড়িয়া ও অন্যান্য
তবে হাটের সর্বাধিক বেচাকেনা চলছে যেখানে সেটার কথা না উল্লেখ করলেই নয়। গ্রামীণ বাসিন্দারা সারিবদ্ধভাবে হাঁড়িয়া বিক্রি করছেন। আর হাটে আগত নারী-পুরুষ নির্দ্বিধায় তার স্বাদ আস্বাদনে মগ্ন। দেখে বাসনা জাগলেও দলের কেউই শেষমেষ হাঁড়িয়া পরখ করতে উদ্যত হয়নি।
তবে একেবারে খালি মুখে না ফিরে সদ্য ভাজা গরম গরম পকৌড়ি পরখ করে বুঝলাম তা কতটা সুস্বাদু! একেবারেই স্থানীয় একটি তেলেভাজার পদ। স্বাদ অসামান্য। ঠোঙা ভর্তি পকৌড়ি মুখে মুখে চালান হয়ে নিমেষে গায়েব।
ফেরত
এবার হোমস্টেতে প্রত্যাবর্তনের পালা। কেয়ারটেকারের সুস্পষ্ট আর্জি ছিল সন্ধের মধ্যে হোমস্টেতে ফেরত আসার। আমরা কথার খেলাপ করিনি। আসলে জঙ্গলমহলের এই দিকটায় অর্থাৎ ঝাড়খন্ড সীমানা লাগোয়া এলাকাগুলি এক দশক আগেও ছিল মাওবাদীদের খাসতালুক। তাই ওই সময় ভ্রমণ স্পট-এর তালিকা থেকে এই জায়গাগুলি ব্রাত্য হয়েছিল। কিন্তু সময় বদলেছে। বদলেছে পরিবেশ-পরিস্থিতি।
পাহাড়,জঙ্গলে আর মানুষের ভয় নেই। ভয় দাঁতাল দলের শ্বাপদের। রাতের আঁধারে তাদের সঙ্গে আমাদের অযাচিত মোলাকাত রুখতেই যে তার এই আর্জি তা বেশ পরিষ্কার।
মশা ও বসা
আরেকটি উপদ্রব, যার কথা না লিখলেই নয় তা হল মশা। হোমস্টের নিচের খাটিয়ায় বসে গল্পগুজব করার সময় ক্রমাগত বাধা সৃষ্টি করে চলেছে এই পতঙ্গ। এক মুহুর্ত ফুরসতের জো নেই। নিরন্তর, নিরলসভাবে শরীরে বিভিন্ন জায়গায় হুল ফুটিয়ে চলেছে। অতঃকিম নিচে আড্ডা দেওয়া মুলতুবি রেখে হোমস্টের ঘরে মুড়ি তেলেভাজা সহযোগে আড্ডা জমালাম। এখানেও তেনারা হাজির। কিন্তু মশা দমনকারী তেলের ব্যবহারে কিছুক্ষণ পরেই মশার আগমনে ভাটা পড়ে । আমরাও নিস্তার পাই।
প্রথম রাত্রে
রাত্রি দশটার মধ্যে নৈশকালীন আহার শেষ। ঘরের জানালা খুলতেই সামনের ভৈরবী পাহাড়ের স্পষ্ট ছায়ারূপ নজরে আসে। শুক্লপক্ষ থাকায় পাহাড়ের আর এক মনোহরিণী রূপ মনকে আরো বেশি করে প্রকৃতিপ্রেমী করে তোলে। স্বচ্ছ চাদরে মোড়া পাহাড়ের অপার্থিব রূপ কখনো ভোলার নয়। পূর্ণিমার টলটলে জ্যোৎস্নায় এই পাহাড়-জঙ্গলের মায়াবী রূপের মানসচিত্র কল্পনায় ধরা দিতেই মন খুশিতে নেচে ওঠে। এই স্থানে দ্বিতীয়বার সফরে এলে নির্ঘাত তা কোন এক পূর্ণিমাতেই হবে।
ভাগ্য সুপ্রসন্ন হলে নিকটবর্তী বাড়িগুলি থেকে ধামসা মাদলের ধ্বনি শোনা যায়। আর সেই মাদলের তালে আদিবাসীদের নাচের সাথে পায়ে পা মিলিয়ে দু’কদম নাচের স্মৃতি যে কোন মতেই বিস্মৃতির অতলে তলাবে না তা হলফ করে বলা যায়।

আমলাশোলে একদিন
পরের দিন, কাকভোরে উঠে প্রতাপদাকে সঙ্গী করে হাঁটা দিলাম আমলাশোল এর উদ্দেশ্যে। দূরত্ব আহামরি কিছু নয়। কাকড়াঝোর-এর পাশের গ্রাম। হাঁটাপথে মিনিট কুড়ি সময় লাগে। আমার কাকড়াঝোর ভ্রমণের আর এক উদ্দেশ্য ছিল আমলাশোল দর্শন। সেই আমলাশোল যা খবরের শিরোনামে আসে 2004 সাল নাগাদ। অনাহারে মৃত্যু হয়েছিল বেশ কয়েকজন আদিবাসীর। আর অপুষ্টি, দুর্ভিক্ষের কবলে জর্জরিত ছিল সমগ্র তল্লাট। সেই আমলাশোলের বর্তমান রূপ জানার তীব্র বাসনা ছিল।
গ্রামের বুক চিরে কংক্রিটের ঢালাই রাস্তার উপর দিয়ে পায়চারি করে যেতে যেতে চোখে আসে কাঁচা-পাকা বাড়ি। গ্রামের মাঝে জলের ট্যাঙ্ক। জায়গায় জায়গায় ট্যাপ কল। গ্রামের সমস্ত বাড়িতে বিদ্যুতের উপস্থিতি। এছাড়াও রাস্তার মোড়ে মোড়ে সৌরবাতিস্তম্ভ। গ্রামজুড়ে শবর ও মুড়া সম্প্রদায়ের মানুষজনের বাস। প্রায় প্রতি বাড়িতেই হাঁস, মুরগি, গরু,ছাগল প্রভৃতি গবাদিপশুর উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো। চাষবাস, গবাদিপশুর প্রতিপালন, বন থেকে কাঠ,শালপাতা ও কেন্দু পাতা সংগ্রহ ছাড়াও এলাকার মানুষজন শীতকালে বাবুই ঘাস থেকে দড়ি বানিয়ে জীবিকা নির্বাহ করে।
এই দৃশ্য দেখে মন ভাল হয়ে গেল। বুঝলাম আমলাশোল তার তিক্ত অতীতের খোলস ছেড়ে নতুনভাবে উন্মোচিত হয়েছে। মনে মনে উপরওয়ালার কাছে আমলাশোলের সামগ্রিক বিকাশের প্রার্থনা প্রতাপদার অলক্ষ্যে সেরেই ফেললাম।
না যাওয়া আমঝর্ণা গ্রাম
আমলাশোল-এর পরের গ্রাম আমঝর্ণা। নাম শুনেই যেতে সাধ হয়। ছবির মতো সুন্দর সে গ্রাম ও তার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। কিন্তু দেরি হয়ে যাওয়ায় আমরা সে পথে না গিয়ে ফেরার পথ নিলাম। ফিরতি পথে দলের বাকি সফরসঙ্গীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ। আমাদের খোঁজ না পেয়ে এই পথে হাঁটা দিয়েছিল।
জিও কাকা!
একটা কথা এই প্রসঙ্গে না বললেই নয়, তা হল এই চত্বরে কিন্তু জিও ছাড়া অন্য যে কোন নেটওয়ার্ক অকেজো। আমার ফোনে ভিন্ন নেটওয়ার্ক থাকায় দুদিন ফোনে বাক্যালাপ হয়নি। ফোনে কেবল ছবি তোলার কাজই হয়েছে অবিরত।
ঝাড়খন্ড-সীমানায় ভৈরব মন্দির
এরপর দলের সকল সঙ্গীরা মিলে একসাথে হাঁটা দিলাম ঝাড়খন্ড সীমানার উদ্দেশ্যে। হোটেল থেকে মিনিট পাঁচেক হাঁটার পর ছোট্ট এক খালের ওপর কংক্রিটের ঢালাই ব্রিজ অতিক্রম করতে ঝাড়খন্ডে হাজির। পথে নজরে আসে এক রংচঙে নজরমিনার। সেটায় আরোহণের চেষ্টা না করে আমরা পৌঁছালাম বাংলা-ঝাড়খন্ডের সীমানা লাগোয়া ভৈরব মন্দির। বড় বড় গাছে বেষ্টিত ঘন জঙ্গলের মাঝে এক সুউচ্চ বাবা মহাদেবের মন্দির। ভিতরে ছোটখাটো পাথরপ্রতিমা। তবে মন্দিরের চারপাশ বেশ পরিষ্কার, পরিচ্ছন্ন। দেখে মনে হল নিত্যপুজোর ব্যবস্থা আছে। এই ভৈরব বাবার নামানুসারেই এলাকাবাসী এই পাহাড়টিকে ভৈরব পাহাড় হিসাবে আখ্যায়িত করেছে। আমাদের হোমস্টের জানালা দিয়ে এই ভৈরব পাহাড়ের মনোরম দৃশ্য স্পষ্ট নজরে আসে।

এবার ফিরাও মোরে
হোটেলে ফিরে গরম গরম লুচি ও তরকারি সহযোগে প্রাতরাশ সেরে বিদায় জানালাম কাঁকড়াঝোরকে। মন কিছুতেই বিদায় নিতে চাইছিল না। আরো প্রাণভরে উপভোগ করতে চাইছিল অফুরান প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং সবুজের সমারোহ।
তবু কালের নিয়মে বিদায় জানাতেই হল কাঁকড়াঝোরকে। যদিও ততক্ষণে সে মনের অন্দরে বাস করার চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত করে ফেলেছে।
———————-

সুমন হাইত
স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার সময় সেভাবে লেখার অভ্যাস বা অবকাশ কোনোটাই হয়ে ওঠে নি। এরপর চাকরি খোঁজার মরিয়া প্রচেষ্টায় পরের কয়েক বছর পার। স্কুল শিক্ষক হিসেবে কর্মরত হওয়ার পরে অল্পস্বল্প লেখার অভ্যাস তৈরি হয়। তাও অবরেসবরে। প্রতিদিন নিয়ম করে পেন, খাতা নিয়ে বসার অভ্যাস আজও ঠিকমতো গড়ে তুলতে পারলাম না। না, এর জন্য সময়কে কাঠগোড়ায় না তুলে অভিযুক্ত করবো নিজে চপল মানসিকতাকে। তার অর্থ ওই….. ভালো লাগলে লিখি, আর না লাগলে লিখি না। ব্যাস, এটুকুই। আর এটুকুতেই যদি কিছু পাঠকের মনে ছাপ ফেলতে পারি, তবে সে আমার পরম প্রাপ্তি। পাঠকের স্বস্তি ও আশীষই তো এক উঠতি লেখকের সম্বল। তাকেই পাথেয় করে এগোতে চাই, আমি, সুমন হাইত।









