সুমন হাইত’এর কলমে
আর্ট ডিরেকশন : প্রসেনজিৎ বেরা
নাগরিক ব্যস্ততা আর যান্ত্রিক রুটিনে যখন শরীর, মন সবই জেরবার তখন কেবলই মনে হয় এক ছুট্টে কোথাও একটা চলে যেতে। অন্তত কয়েক ঘণ্টার ফুরসতেও ফুরফুরে হতে চায় দেহ নামক এই জৈবিক যন্ত্রটি।
এমনই এক ব্যস্ততাকে একদিনের জন্য বিশ্রাম দিয়ে বছরখানেক আগে প্রতাপদা, বুবুন আর বিমলকে সঙ্গী করে বেড়িয়ে এসেছিলাম পাথরা।
বড় পাথর চাপা কপাল এই পাথরা’র। শুভানুধ্যায়ীদের পা খুব একটা পড়ে না এ পথে। নাহলে কি নেই পশ্চিম মেদিনীপুরের এই দেউল গ্রামে! কাঁসাই এর তীরের চোখ জুড়ানো সৌন্দর্য, ইতিউতি ইতিহাসের হাতছানি, গোটা গ্রাম জুড়ে অপরূপ কারুকার্যের টেরাকোটা মন্দিরের ছড়াছড়ি…. সব যেন ছবির মতো করে সাজানো। অথচ তা যথোপযুক্ত রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ও সরকারী উদাসীনতায় ক্রমশ বিনষ্ট হওয়ার মুখে।
বাংলার আনাচে কানাচে লুকিয়ে থাকা এরূপ মণিমুক্তগুলি চিরদিনই লোকচক্ষুর অন্তরালে থেকে গেছে। পর্যটকদের কাছে উন্মোচিত হতে পারে নি। অথচ এই রকমই পাথুরে স্থাপত্য প্রত্যক্ষ করতে আমরা কত টাকা ব্যয় করে, মূল্যবান সময় অতিবাহিত করে দেশ বিদেশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ধেয়ে যাই! আর পাথরা’র মতো বিস্ময়কর পুরাকীর্তিগুলি দুয়োরানির মতো ব্রাত্যই রয়ে যায় দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর। উপেক্ষা আর বঞ্চনা ব্যতীত কিছুই জোটে না কপালে। এ যেন বুকভরা একরাশ অভিমান নিয়ে কালের গর্ভে বিলীন হওয়ার পথে ধীরে ধীরে অগ্রসর হওয়া।
জনপ্রিয় এক বাংলা ট্রাভেল ম্যাগাজিনে ছবি দেখেই ঠিক করেছিলাম এবার ছোট্ট ছুটিতে পাথরা প্রত্যক্ষ করার।
দূরত্ব আহামরি নয়। মেদিনীপুর রেল স্টেশন থেকে মেরেকেটে ১০-১১ কিমি। আমরা তো দিব্যি ঘুরে এলাম টোটো করে। এই অপেক্ষাকৃত ধীর গতির যানে সওয়ার হওয়ার সুবাদে চারিপাশের খোলামেলা পরিবেশকে আরো ভালোভাবে পর্যবেক্ষণের সুবিধা মেলে।
পাথরা’র নামকরণে দ্বিমত মেলে। পাথরাকীর্ণ থেকে এই গ্রামের নাম হয় পাথরা। চারিপাশে পাথরের ছড়াছড়ি বা প্রস্তরখন্ডের আধিক্য দেখে নামকরণের স্বার্থকতা দিব্যি মালুম হয়।
নামকরণের দ্বিতীয় তত্ব ইতিহাস বিজড়িত।
সে বেশ পুরানো আমলের কথা। আনুমানিক ১৭৩২ খ্রিস্টাব্দের কাছাকাছি নবাব আলীবর্দী খাঁ তাঁর এক মুসমাদার বা নায়েব বৈদ্যনাথ ঘোষাল ওরফে দয়ানন্দকে দায়িত্ব দেন স্থানীয় রতনচক পরগণার কর আদায়ের। এদিকে রাজস্বের টাকা হাতে পেয়ে সেই অর্থে এক মন্দির নির্মাণের কাজ শুরু করে দেন ধার্মিক দয়ানন্দ। খবর পেয়ে নবাবের মাথা আগুন। সাথে সাথে জরুরী তলব। পাগলা হাতির পায়ে পিষে ফেলার দন্ড দেন দয়ানন্দকে।
রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষারত জনতাকে অবাক করে বধ্যভূমে নিশ্চল থাকে হাতি। ঘটনার আকস্মিকতায় সকলেই হতবাক। বিস্মিত নবাব এরপর নিঃশর্ত মুক্তি দেন দয়ানন্দকে।
হাতির পা থেকে বাঁচা বা পা- উৎরা থেকে পাথরা নামের সৃষ্টি বলেই অনেকের ধারণা।
শোনা যায়, এরপরই রতনচকের জমিদারী পেয়ে একের পর এক বিভিন্ন আদলের মন্দির তৈরি করেন দয়ানন্দ।
প্রায় আড়াই শতক পূর্বে নির্মিত অজস্র মন্দিরের মধ্যে এখন আর অবশিষ্ট রয়েছে ৩২-৩৪ টি। তাদের অবস্থাও তথৈবচ।
মূলত এটেল মাটি পুড়িয়েই নির্মিত হয়েছে মন্দিরগুলি। প্রতিটি মন্দিরের কারুকাজ পৃথক ও বিস্ময় উদ্বেককারী। বেশীর ভাগ দেউলই অধুনা বিগ্রহশূন্য। কিছু মন্দির আছে গ্রামের ভিতরে। বাকিগুলি কাঁসাইয়ের তীরে।
পুরাতত্ত্ববিভাগ কেবল নিয়মরক্ষার্থে তাদের বিজ্ঞপ্তি ঝুলিয়ে দায়িত্ব সেরেছে। ইতিমধ্যেই নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে বেশ কিছু মন্দির। বাকিগুলিও প্রহর গুনছে। এভাবে চলতে থাকলে কয়েক বছরের মধ্যেই অনিন্দ্যসুন্দর এই দেউলগ্রাম দেউলিয়া হয়ে যাবে।
এই ভাঙ্গন ও ক্ষয়ের মাঝেও সাধ্যমত প্রচেষ্টা চালিয়ে মন্দির রক্ষার গুরুদায়িত্ব স্বেচ্ছায় কাঁধে তুলে নিয়েছেন শ্রদ্ধেয় মহম্মদ ইয়াসিন। মূলত তাঁরই উদ্যোগে ও তৎপরতায় গঠিত হয়েছে এক মন্দির সংরক্ষণ কমিটি।
শুধু বিস্মরণ আর রোমন্থনের আজব পুরাকীর্তিই নয়, পাথরা আপনাকে মুগ্ধ করবে অসামান্য প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কারণেও। গাঁয়ের গা ঘেঁষে বয়ে যাওয়া সুন্দরী কাঁসাই ও তার দুই পাড়ের প্রাকৃতিক শোভায় চোখ জুড়াতে বাধ্য।
আশা রাখি, অদূর ভবিষ্যতে এই দেউলপুর তার হারানো শ্রী পুনরুদ্ধার করে আবারো পর্যটকদের নেকনজরে আসবে।
ফেরার পথে চাক্ষুষ করলাম পবিত্রভূমি হাবিবপুর। এখানেও ইতিহাসের হাতছানি।
আদতে সমগ্র মেদিনীপুরই ইতিহাস বিজড়িত। বিশেষত স্বাধীনতা সংগ্রামের সাথে এই জেলার সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড়। এতো বিপ্লবীদের পীঠস্থান। অগুন্তি বীর সন্তানের স্মৃতি পরতে পরতে জড়িয়ে আছে জেলার বিভিন্ন প্রান্তে।
অগ্নিযুগের এমনই এক বীর বিপ্লবী ক্ষুদিরাম বসুর জন্মভিটে এই হাবিবপুর।
সরকারী হস্তক্ষেপে বর্তমানে এই বসতবাড়িটির আমূল সংস্কার হয়েছে। তবুও ইতিহাস প্রত্যক্ষ করার ও তার সাথে একাত্ম হওয়ার মজাই আলাদা।
শহীদ ক্ষুদিরামের জন্মভিটের ঠিক বিপরীতেই রয়েছে সুদর্শন সিদ্ধেশ্বরী কালীমন্দির। কথিত, এই মাতৃ মন্দিরেই দীক্ষা নিয়ে দেশ মাতৃকার জন্য জীবন উৎসর্গ করার শপথ নেন কিশোর ক্ষুদিরাম। স্বাধীনতার জন্য বীর ক্ষুদিরামের আত্মত্যাগের স্মৃতিচারণে সারা শরীর জুড়ে শিহরণ জাগে।
তাই বলি কি, আর অপেক্ষা কিসের? সময়, সুযোগ বের করে কয়েক ঘণ্টার জন্য ঘুরেই আসুন না পাথরা, হাবিবপুর। ইতিহাস চাক্ষুষ করার এমন সুবর্ণ সুযোগ কি হেলায় হারানো যায়???

সুমন হাইত
স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার সময় সেভাবে লেখার অভ্যাস বা অবকাশ কোনোটাই হয়ে ওঠে নি। এরপর চাকরি খোঁজার মরিয়া প্রচেষ্টায় পরের কয়েক বছর পার। স্কুল শিক্ষক হিসেবে কর্মরত হওয়ার পরে অল্পস্বল্প লেখার অভ্যাস তৈরি হয়। তাও অবরেসবরে। প্রতিদিন নিয়ম করে পেন, খাতা নিয়ে বসার অভ্যাস আজও ঠিকমতো গড়ে তুলতে পারলাম না। না, এর জন্য সময়কে কাঠগোড়ায় না তুলে অভিযুক্ত করবো নিজে চপল মানসিকতাকে। তার অর্থ ওই….. ভালো লাগলে লিখি, আর না লাগলে লিখি না। ব্যাস, এটুকুই। আর এটুকুতেই যদি কিছু পাঠকের মনে ছাপ ফেলতে পারি, তবে সে আমার পরম প্রাপ্তি। পাঠকের স্বস্তি ও আশীষই তো এক উঠতি লেখকের সম্বল। তাকেই পাথেয় করে এগোতে চাই, আমি, সুমন হাইত।









