তরুণকান্তি বারিক’এর কলমে
১।
বাঁটুল দি গ্রেট। এই নামটার, বলা ভাল, এই চরিত্রটির সঙ্গে পরিচয় সেই কোন ছেলেবেলায়। থাকতাম গ্রামে। বাড়িতে আসত নানা ধরনের পত্রপত্রিকা। সে বয়সে সবগুলো হাতে নেবার অনুমতি ছিল না। যেগুলো হাতে আসত তাদের মধ্যে শুকতারা ছিল অন্যতম। আর পাতা উলটে সবার আগে যেটা পড়তাম সেটা ছিল বাঁটুল দি গ্রেট। তারপর হাঁদা-ভোঁদা। লেখা আর ছবির একেবারে শেষে থাকত একটা ছোট্ট সই— না। না টা এমনভাবে লেখা মনে হতো সেটাও একটা ছবি। এই ‘না’ হলেন নারায়ণ দেবনাথ।
বাঁটুল আর নারায়ণ দেবনাথ একাকার হয়ে গেলেন আমার কাছে। সে বয়সে এত তো বোঝার ক্ষমতা ছিল না। অসম্ভব একটা আকর্ষণ অনুভব করতাম। অপেক্ষা করে থাকতাম পরের সংখ্যার জন্য।
আমার প্রথম আঁকার ইচ্ছেও জাগে বাঁটুলকে দেখে। ছবিগুলো দেখে কপি করতাম। আর একটা কাজ হত, না হারার জেদ তৈরি হত। বাঁটুল যেমন অনায়াস জিতে যায় সবকিছুতে!
জীবনের অনেকটা পথ পেরিয়ে বুঝলাম কী অসম্ভব দক্ষতা তাঁর। তিনি শুধু ছবি আঁকছেন না, লিখছেন গল্পও। নিত্য নতুন। টের পেতে থাকলাম ছোটদের মনের হদিশ তাঁর হাতের মুঠোয়। তাঁর মধ্যেও ছিল এক শিশু মন। না হলে এমন সৃষ্টি সম্ভব হত না। তাঁর ছবি-লেখা কখনও শিশুমনকে বিপথে চালিত করেনি। যেটা অনেক শিশুসাহিত্যিক ভুলে যান।
২।
বেশ কিছু বছর আগে একটি ব্যবসায়িক সংস্থার জন্য বসে আঁকো প্রতিযোগিতার পরিকল্পনার সময় বিচারক কারা হবেন ভাবতে গিয়ে তাঁর কথা মাথায় আসে। যোগাযোগ করি। পৌঁছই তাঁর শিবপুরের বাড়িতে। তিনি তখন তাঁর কাজের টেবিলে বসে আঁকছিলেন। বাঁটুল দি গ্রেট। চোখের সামনে এমন দৃশ্য আমাকে বাক রুদ্ধ করে দিল। একটা ছোট্ট ঘর, ঘরের একদিকে একটা খাট। দরজা দিয়ে ঢুকলেই তাঁর কাজের টেবিল। আমি দরজায় ঠায় দাঁড়িয়ে। তিনি ইশারা করে বসতে বললেন। আঁকা থামালেন। আমার ঘোর কাটছে না। তিনি জানতে চাইলেন আসার কারণ।
বললাম আমাদের পরিকল্পনার কথা। আমি ঠিক করেছিলাম সাধারণত যেভাবে বসে আঁকো হয় সেভাবে না করে শিশুসাহিত্য থেকে পাঠ করে শোনানো হবে, সেটা শুনে ছোটদের যা মনে হবে তাই তারা আঁকবে। আমি চেয়েছিলাম গতানুগতিক যেভাবে ছোটরা শিখে আসে সেটা ভাঙতে। একই ছবি বারবার অভ্যাস করলে দক্ষ কারিগর হয়ে ওঠা যায় কিন্তু শিল্পী হতে গেলে কল্পনাশক্তির প্রয়োজন। তিনি খুশি হলেন। সম্মতি দিলেন। এলেন।
এমন সহজ মানুষ দুটি দেখিনি। তারপর বেশ কয়েকবার তাঁর কাছে আসার সুযোগ হয়েছে। সে স্মৃতি আজীবন বয়ে বেড়াব।
নারায়ণ দেবনাথ, আজও আমার কাছে এক স্বপ্নের নাম। তাঁর সৃষ্টির প্রতি আমার অমোঘ টান আমৃত্যু বয়ে বেড়াব। এর থেকে বেশি বলার যোগ্যতা নেই আমার। প্রণাম।

তরুণকান্তি বারিক
পড়াশোনা বিজ্ঞান নিয়ে। অনুরাগ সাহিত্যে। দীর্ঘদিন 'উড়োজাহাজ' শিশুপত্রিকার সম্পাদনা করেছেন। কাজকর্ম বিজ্ঞাপনের ছবি আঁকা-লেখা আর ছবি বানানো । বয়স ষাট পেরোল।









